দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে শাখা ও সেবার বিস্তারে শীর্ষে রয়েছে সোনালী ব্যাংক পিএলসি। সরকারি লেনদেন পরিচালনার পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রপ্তানি এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন করছে ব্যাংকটি। দেশে-বিদেশে অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়েও এগিয়ে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক। তবে ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ ব্যবস্থাপনায় তদারকি বাড়ানো এবং সুশাসন আরও শক্তিশালী করা। সার্বিক বিষয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ‘দেশ রূপান্তর’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান।
প্রশ্ন : দেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি ও ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় সোনালী ব্যাংক নিজেকে কীভাবে দেখছে?
উত্তর : সোনালী ব্যাংক নিজেকে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে দেখে না। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্র ও জনগণের সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা প্রদান, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
প্রশ্ন : আগামী তিন বছরে সোনালী ব্যাংকের প্রধান অগ্রাধিকার কী কী?
উত্তর : আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সুশাসন আরও শক্তিশালী করা। বর্তমানে আমাদের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। চলতি বছরে তা ১২ থেকে ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনাটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সোনালী ব্যাংককে আরও শক্তিশালী, আস্থাশীল ও টেকসই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে চাই।
প্রশ্ন : খেলাপি ঋণ এখন জাতীয় অর্থনীতির বড় ঝুঁকি। এ প্রেক্ষাপটে সোনালী ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা কী?
উত্তর : সোনালী ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থানে থাকলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমার বিবেচনায়, ঋণ ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতা হলো ঋণ অনুমোদনের পর তদারকির ঘাটতি। ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশ্ন : ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ এড়াতে কী ধরনের সুরক্ষা রয়েছে?
উত্তর : বর্তমানে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ নেই। প্রতিটি ঋণ প্রস্তাব নীতিমালা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও বিধিবিধানের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয়। ফলে বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা ইউনিট স্বাধীনতাভাবে ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রশ্ন : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বোর্ড, ঋণ কমিটি ও নিরীক্ষা কমিটিকে আরও পেশাদার ও স্বাধীন করার প্রয়োজন আছে কি?
উত্তর : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বর্তমানে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তবে ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান জটিলতা ও ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এসব প্রতিষ্ঠানের পেশাগত সক্ষমতা ও স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে।
প্রশ্ন : ব্যাংকিং কার্যক্রমে সোনালী ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি কতটা?
উত্তর : মুনাফার একটি অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে এলেও আমাদের প্রকৃত শক্তি মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমেই নিহিত। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রপ্তানিসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি। শুধু মুনাফা অর্জনই উদ্দেশ্যে নয়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখাও আমাদের দায়িত্ব। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সোনালী ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি ও সাফল্য প্রতিফলিত হয়।
প্রশ্ন : এসএমই, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ পাওয়া এখনো কঠিন। অন্যদিকে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
উত্তর : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি খাতে আমাদের ঋণ কার্যক্রম রয়েছে, এটা আরও বাড়ানো হবে। যারা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসা করতে চান এবং যাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে, তাদের অর্থায়ন করতে আমরা আগ্রহী। গ্রাহকই ব্যাংকের প্রাণ। তাই বড় বিনিয়োগের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ও বহুমুখী বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
প্রশ্ন : ব্যাংক খাতে চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান কোথায়?
উত্তর : ঋণ আদায় জোরদারে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করেছি। প্রচলিত সব আইনি ও প্রশাসনিক উপায় যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। আমাদের ঋণপোর্টফোলিও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কোনো তারল্যসংকট নেই। ২ লাখ কোটি টাকার বেশি আমানত আছে। এই বিপুল আমানতের নিরাপদ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই।
প্রশ্ন : নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে ‘বাংলা কিউআর কোড’ কতটা যৌক্তিক মনে করেন?
উত্তর : একই কিউআর কোড ব্যবহার করে গ্রাহকরা সহজে ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারবেন। এতে লেনদেনের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি অর্থ পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত খরচ এবং অপচয়ও কমবে। এ কারণে বাংলা কিউআরের বিস্তার ও ব্যবহার নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে সোনালী ব্যাংক কতটা এগিয়েছে? গ্রাহকের ডিজিটাল নিরাপত্তায় কী উদ্যোগ রয়েছে?
উত্তর : সোনালী ব্যাংক সুশাসন ও প্রযুক্তির হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এটাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি। গ্রাহকের তথ্য ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। আমাদের ১ হাজার ২৩৫টি শাখা পুরোপুরি অনলাইন ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। দেশের বাইরেও রয়েছে দুটি শাখা। সোনালী ই-ওয়ালেট ও ই-সেবা অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকিং সেবা নিতে পারেন। নিজস্ব সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের অর্থ পরিশোধ ও গ্রহণ করা যায়। রেমিট্যান্স সেবার জন্য দেশের বাইরে আমাদের দুটি শাখা রয়েছে। পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রাম, এক্সপ্রেস মানি, রিয়া, ট্রান্সফাস্ট ও ন্যাশনাল মানির মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত ও নিরাপদে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।