পানিবন্দি আড়াই লক্ষাধিক পরিবার

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৬ এএম

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে এখনো বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বন্যায় এসব জেলায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। এদিকে কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো পানিবন্দি রয়েছে দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার। পাহাড়ধস ও বন্যায় এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৩৯ জন আহত হয়েছে। দুর্গত এলাকার সাতটি জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার বন্যাআক্রান্তদের নগদ পৌনে ৩ কোটি টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ টন চাল সহায়তা দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গতকাল রবিবার এ তথ্য জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। চট্টগ্রামে পানিবন্দি আছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার। জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ১২ জন আহত হয়েছেন। কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন, আহত হয়েছেন ২৪ জন। বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় ছয়জন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। সাত জেলায় এখনো ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

এ ছাড়া বান্দরবানে ১২ হাজার ৫০০টি, মৌলভীবাজারে ৭ হাজার ৩০৮টি, হবিগঞ্জে ৬ হাজার ৪৪৪টি, রাঙ্গামাটিতে ১ হাজার ৪৪টি এবং খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ৭৩টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। দুর্গতদের জন্য গত ছয় দিনে সরকার ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নগদ এবং ৩ হাজার ২৫০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। সে হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিপ্রতি নগদ বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ টাকা এবং চাল প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।

এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের প্রভাবে কয়েকটি নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি অথবা বিদ্যমান বন্যার কিছুটা অবনতি হতে পারে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু ও খোয়াই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। গতকাল দুপুরে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তিন দিনের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল রবিবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে আগামী পাঁচ দিন সারা দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ দিনই আট বিভাগের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

বান্দরবানের অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে : বান্দরবানে পাহাড়ধসে ৫ জন ও পানিতে ভেসে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়ক ও জেলা সদরের সঙ্গে আলীকদম, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বেইলি সেতু ভেঙে যাওয়ায় বন্ধ আছে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়ক। কোথাও কোথাও পাহাড়ধসের পাশাপাশি সেতুও বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ দশমিক ৮৭ মিটার, মাতামুহুরী নদীর পানি ১০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানে পাহাড়ধসে ৫ জন ও পানিতে ভেসে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৬ পয়েন্টে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলায় পানিবন্দি আছে সাড়ে ৮ হাজার পরিবার। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।

রাঙ্গামাটিতে ১০৪৪ পরিবার পানিবন্দি : বন্যাকবলিত রাঙ্গামাটির বরকল, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, লংগদু ও রাজস্থলী উপজেলার নিম্নাঞ্চলের এক হাজার ৪৪ পরিবার এখনো পানিবন্দি। তবে বৃষ্টিপাত কমে আসায় বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। রাইংক্ষ্যং নদীর পানি কমে আসায় বিলাইছড়ির ফারুয়ার বাজার থেকে পানি নেমে গেছে। পানি নামার পর ফুটে উঠেছে ক্ষতচিহ্ন। বরকলের ঠেগা খুব্বাং, চুমাচুমি, পুলছড়া, গুরিয়েছড়া ও গামারীতলা গ্রামের কয়েকশ পরিবার এখনো পানিবন্দি। পানি কমে আসায় দীঘিনালার সঙ্গে লংগদু এবং সাজেক সড়ক সচল হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় তিন হাজার ৬৩৭ জন অবস্থান করছে। জেলায় ১৩১টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পানিতে ডুবে এবং গাছ উপড়ে মারা গেছেন তিনজন। পানিবন্দি মানুষদের খাবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাঙ্গামাটির ওমদা মিয়া হিল পৌর জুনিয়র হাই স্কুল আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। সবাইকে ধৈর্য ধরে দুর্যোগ মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার দুর্গত মানুষের পাশে আছে। এ সময় রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পানিতে ভাসছে টেকনাফ, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি : টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায়। টেকনাফ সদর, পৌরসভা, সাবরাং, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে এক লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানির কারণে টেকনাফ পৌরসভা, টেকনাফ সদর ও সাবরাং ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখন পানির নিচে। বানের পানিতে টেকনাফ-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের বেশ কিছু অংশ তলিয়ে যাওয়ায় এবং পাহাড়ধসে সড়কের ওপর পড়ায় দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে অঞ্চলগুলোয় পাহাড়ধসের তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করছে স্থানীয় প্রশাসন।

বৈরী আবহাওয়ায় বিপাকে জেলেরা : উত্তাল সাগর আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর কোড়ালিয়া মৎস্যঘাটে আনোয়ার হোসেন নামের এক জেলে বলেন, ‘৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কোনো আয় ছিল না। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর কয়েক দিন মাছ ধরেছি। এরপর আবার টানা বৈরী আবহাওয়ায় বসে আছি। সাগরে এখনো অনেক ঢেউ। এমন অবস্থায় গেলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারপরও পেটের দায়ে অনেক জেলে ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যায়। না গেলে তো সংসার চলবে না।’ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মাছ ধরার একটি ট্রলার ডুবে যায়। ওই ঘটনায় গলাচিপার পাঁচ জেলের এখনো সন্ধান মেলেনি।

পেকুয়ায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু : কক্সবাজারের পেকুয়ায় সৃষ্ট বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্তের পাশাপাশি প্রাণহানির ঝুঁকিও বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পাহাড়ধসে হতাহতের পর এবার বাড়ির উঠানে জমে থাকা বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে মুশফিকুর রহিম নামে ২১ মাস বয়সী এক শিশু। গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় ঘটনা ঘটে। সে সৌদিপ্রবাসী নাছিরের ছেলে। ইউএনও রফিকুল ইসলাম শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কয়েকটি এলাকায় এখনো পানি রয়েছে।

নেত্রকোনায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে : কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ে ঢলে নেত্রকোনায় বেড়েছে নদ-নদীর পানি। জেলার পাহাড়ি সীমান্ত উপজেলা কলমাকান্দায় আন্তঃসীমান্ত সোমেশ্বরীর নদীর শাখা নদী উপদাখালি ডাকবাংলা পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ৫টি বড় নদ-নদীর মধ্যে তিনটির পানি বৃদ্ধি পেলেও বন্যা পরিস্থিতির কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে পাউবো। আটপাড়া উপজেলায় মগড়া নদী, খালিয়াজুরী উপজেলায় ধনু নদ এবং কংস নদীর জারিয়া ঝান্জাইল পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মৌলভীবাজারে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট : মৌলভীবাজারে বন্যার পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে এখন দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্যার পানি কিছুটা কমায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে বাড়িঘরে কেবলই ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ। দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকায় অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র, আসবাবপত্র ও মজুত রাখা খাদ্যশস্য। এই মুহূর্তে তাদের জরুরিভিত্তিতে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও করছেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত