মেহেরপুরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের হার ক্রমেই বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মেহেরপুরে বর্তমানে দিনপ্রতি ৪টি করে তালাকের ঘটনা ঘটছে। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, লাফিয়ে লাফিয়ে তালাকের হার বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগের। বর্তমানে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার প্রবণতা বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে তিনটি কারণ দেখিয়ে ১০৩ জন নারী তাদের স্বামীকে তালাক দিয়েছেন। কারণগুলো হলো অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনোতে সম্পৃক্ততা, বিয়ে করে স্বামীর বিদেশে থাকা এবং মাদকাসক্ত হয়ে পড়া।
মেহেরপুর পৌরশহরের মল্লিকপাড়ার মিম আক্তার। তিনি তার স্বামী আনাম নিশানকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তালাক দিয়েছেন। এফিডেভিটে স্বামীকে তালাক দেওয়ার কারণে লিখেছেন, বিয়ে করে স্বামীর দীর্ঘ প্রবাসবাস। দেশে কম আসা, খোঁজখবর না নেওয়া ইত্যাদি। একই কারণে উল্লেখ করে তালাক দিয়েছেন মেহেরপুর সদর উপজেলার শোলমারী গ্রামের কলেজপড়–য়া ছায়াবীথি, পাশের গ্রাম রুদ্রনগরের সালমা ইসলাম, আমঝুপি গ্রামের নাসরিন সুলতানা, বারাদী গ্রামের জান্নাতুল খাতুন। এদের সবার স্বামী বিয়ে করে বিদেশে গিয়ে এখন দেশে কম আসেন। অল্প এবং মধ্যবয়সী এই সময় নারীরা জানান, প্রবাসবাস স্বামীরা স্ত্রীর চাহিদা পূরণে উদাসীন। শ^শুরবাড়িতে যৌথ পরিবারে থাকতে হয়। স্বামীর অনুপস্থিতিতে শাশুড়ি-ননদরা মানসিক অত্যাচার করে থাকেন।
শহরের কালাচাঁদপুরের মুন্নী পারভীন তার স্বামী আশিক রহমান মিয়াকে তালাক দিয়েছেন। তালাকে কারণ হিসেবে লিখেছেন মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি এবং ক্যাসিনো খেলোয়াড়। মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের চারুলতা জ্যোতি তালাকের এফিডেভিটে লিখেছেন, তার স্বামী লিজন শেখ একজন ক্যাসিনো জুয়াড়ি। মেহেরপুর সদর উপজেলার বারাদি বাজারের মনিরা খাতুন তার স্বামী মোনায়েম হোসেনকে দেওয়া তালাকনামায় লিখেছেন, স্বামী নেশায় আসক্ত এবং জুয়াড়ি। জুয়া খেলার টাকার জোগান পেতে স্ত্রীর কাছে যৌতুকের দাবি জানিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে।
গাংনী উপজেলার ইসলাম নগরের মানছুরা খাতুন বিয়ের ২২ বছর পর তার স্বামী জুগিন্দা গ্রামের হাসান আলিকে তালাক দিয়েছেন। তিনি তালাকনামায় লিখেছেন, তাদের একটি ছেলে সন্তান আছে। তার স্বামী প্রবাসে কর্মরত ছিল। বিদেশ থেকে দেশে এসে জুয়ায় যুক্ত হয়ে সব হারিয়েছেন। এখন কোনো কাজকর্ম করেন না। জুয়া খেলার টাকার অভাব পড়লে স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য মারধর করেন। মুজিবনগর উপজেলার জেবা খাতুন বিয়ের চার বছর পর স্বামী ইমরানকে তালাক দিয়েছেন। তালাকের কারণ হিসেবে লিখেছেন, তার স্বামী মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। ইতিমধ্যে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক নিয়ে নষ্ট করেছেন। এ ছাড়া তার স্বর্ণালংকার চুরি করে বিক্রির সেই টাকাও জুয়াতে ধ্বংস করেছেন।
একাধিক নিকাহ রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তালাকের কারণগুলোর মধ্যে বিস্ময়করভাবে নতুন করে সংযোজন হয়েছে মাদক এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হওয়া। এর বাইরে অন্য কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অপব্যবহার, স্বামীর পরিবারে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে স্ত্রীর বাবা-মায়ের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, সঠিকভাবে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না দেওয়া এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। নিকাহ রেজিস্ট্রাররা এজন্য প্রযুক্তির অপব্যবহারকে বেশিভাবে দায়ী করছেন।
মেহেরপুর নারী ও শিশু আদালতের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রাররা তালাকের বড় একটি কারণ উল্লেখ করেননি সেটা হলো বাল্যবিয়ে। যেহেতু নিকাহ রেজিস্ট্রাররা বেশি অর্থের বিনিময়ে এসব বাল্যবিয়ে গোপনে দিয়ে থাকেন, সেখানে শর্ত থাকে প্রাপ্ত বয়স হলে কাবিননামা দেওয়া হবে। অর্থাৎ কাবিননামা ছাড়াই এসব বিয়ে হওয়ার কিছুদিন পর ছাড়াছাড়ি বা নির্যাতন হলে মেয়েরা আদালতে এসে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করেন। বৈধ কাগজ ছাড়াই বিয়ে করার কারণে আদালত মামলাগুলো তদন্তে দিলে বাল্যবিয়ের সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্যপ্রমাণে এসব নিকাহ রেজিস্ট্রাররা বাল্যবিয়ের অপরাধে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
মেহেরপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২০২৩ সালে জেলায় মোট ২ হাজার ১০০টি বিয়ের পাশাপাশি ১ হাজার ৯২৯টি তালাক রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ২৬টি বিয়ের বিপরীতে তালাক হয়েছে ২ হাজার ১০টি। ২০২৪-২০২৫ সালে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১২৩টি বিয়ের বিপরীতে তালাক হয়েছে ৮৯১টি। অর্থাৎ দিনপ্রতি তালাকের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪টি।
সরকারি নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার এম এ মাবুদ বলেন, গত বছর থেকে এ বছরে তালাকের হার বেড়েছে। মাদক, জুয়া ও ক্যাসিনো খেলার কারণ উল্লেখ করেই বেশির ভাগ তালাক দেওয়া হচ্ছে। এর থেকেই স্পষ্ট মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া ও মাদক পরিবার ধংসের ভয়ংকর কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি একরামুল হক বলেন, গত ৬ মাসে ১০৩ জন নারী তালাকের কারণ হিসেবে মাদক, স্বামী বিদেশে থাকা এবং অনলাইন জুয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি তালাকের এই প্রবণতার পেছনে বিয়ে পরবর্তী ছেলে-মেয়ের মানসিক বৈষম্য, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির দুর্ভিক্ষসহ পারিবারিক শিক্ষার অভাবকে দায়ী করছেন।
মেহেরপুর সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সমাজ বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল আমিন ধূমকেতু বলেন, ‘মেহেরপুর সীমান্ত জেলা। সে কারণে মাদক প্রবণতা বেশি। এ জেলার প্রচুর সংখ্যক যুবক বিদেশে থাকেন। সেই সঙ্গে এই জেলা অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো খেলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এসব কারণে বিয়ে এবং তালাক এই জেলায় খুবই বেশি, যা চরম উদ্বেগের। এক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখনই দরকার।