তিস্তায় বিপৎসীমার ওপরে পানি, বন্যার আশঙ্কা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

তিস্তা নদীতে বড়ধরনের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উজান থেকে ধেয়ে আসছে প্রচণ্ড ঢল। এতে তিস্তা রূদ্রমূর্তি ধারন করতে পারে।

টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে ফের ফুঁসে উঠেছে তিস্তা নদী।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকাল ৬টায় দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারেজের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে (খালিশাচাপানি বাইশপুকুর) তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার (৫২.১৫) ৩ সেন্টিমিটার (৫২.১৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর আগে দুপুর ৩টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার (৫২.১০) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিন ঘন্টায় তিস্তা নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তিস্তা ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি আরও জানান, আগাম বার্তা অনুযায়ী তিস্তার পানি আগামী ২৪ ঘন্টা ব্যাপী বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। যা বড় বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে, তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে গত দুই মাসের ব্যবধানে পঞ্চমবারের মতো তিস্তায় পানি বৃদ্ধির কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে তিস্তাপাড়ের মানুষের।

এদিকে উজান থেকে নেমে আসা তিস্তা নদীতে প্রবাহিত পানি এখন ঘোলা (কাঁদামাটি)। সাথে গাছের ডালা, কাঠ ও কচুরিপানাও ভেসে আসছে।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপ করা নুরুল ইসলাম জানান, সোমবার (১৩ জুলাই) বিকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে তিস্তা নদীর পানি এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় ৫২দশমিক ০০ সেন্টিমিটার, বেলা ১২টায় ৫২ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার ও দুপুর ৩টায় ৫২ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল; যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তিন ঘন্টায় পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিকাল ৬টায় তিস্তার রংপুর কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার (২৯.৩০) ৪০ সেন্টিমিটার (২৮.৯০) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে মধ্যে রাতে কাউনিয়া পয়েন্ট বিপদসীমা অতিক্রম করবে।

তিনি আরও বলেন, এরআগে রবিবার (১২ জুলাই) রাত ৯টার দিকে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার (৫১.৯৩) নিচে ছিল। রবিবার রাত ৯টা থেকে সোমবার বিকাল ৬টা পর্যন্ত ১৮ ঘন্টায় তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পায় ২৫ সেন্টিমিটার।

সূত্র মতে, উজানে বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উজানের ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দো-মোহনী ও কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তায় কমলা সংকেত জারী করা হয়েছে বলে ভারতীয় সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

সেখানে জানানো হয়, তিস্তা নদীর উজানে ভারতের দো-মোহনী পয়েন্টে বিকাল ৫টায় সেখানকার বিপৎসীমার (৮৫ দশমিক ৯৫) ৩ সেন্টিমিটার (৮৫ দশমিক ৯৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ অংশের ডালিয়ায় তিস্তার ব্যারেজ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তার প্রবাহ বিকাল ৫টায় বিপৎসীমার (৬৫ দশমিক ৯৫) ৭ সেন্টিমিটার (৬৬ দশমিক ০২) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বরত) মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এছাড়াও এ সময়ে গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদী ও কুড়িগ্রাম জেলায় ধরলা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, বিকাল ৬টায় তিস্তা নদী বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রবাহিত পানি লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাতে পারে বলে তিনি জানান।

এদিকে তিস্তায় পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চল এলাকায় পানি প্রবেশ করছে বলে চর এলাকার বাসিন্দারা জানায়। তারা বলেন, উজান হতে নেমে আসা তিস্তা নদীতে প্রচুর ঘোলা (কাঁদামাটি) পানি আসছে। এছাড়া পানি প্রবাহের সাথে গাছের ডালা, কাঠ ও কচুরিপানাও আসছে।

ঝাড়সিংহেশ্বর চর গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, গত দুই মাসে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যে থাকায় আমার এ বছরে আমন ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া চরের অনেক কৃষকের বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টাসহ অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

তিস্তাপাড়ের বাইশপুকুর এলাকার বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিকাল ৬টায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে এলাকার নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এছাড়া উজানের পানি প্রচুর ঘোলা ও সাথে বড়-ছোট গাছের ডালা, কাঠ ও কচুরিপানাও পানির সাথে ভেসে আসছে।

জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানান, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে তার ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর ও পূর্ব ছাতনাই গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ২০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

ডিমলা টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ইতোমধ্যে আমার ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে চর এলাকার ১ হাজার ৩৫০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, চলতি বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদী প্রথম বিপৎসীমা অতিক্রম করে ২৩ জুন। সেসময় বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এরপর পানি নেমে যায়। দ্বিতীয় দফায় ২৮ জুন বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছিল। যার ১২ ঘন্টা পর পানি কমে বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। এরপর তৃতীয় দফায় গত ৭ জুলাই তিস্তা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে রাত ৮টার দিকে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। সবশেষ গত ৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার (৫২.১৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত