‘অ্যাক্ট অব গড’ ও ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৯ এএম

টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। কিন্তু সারা শহর আর চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড তো এককথা নয়। বৃষ্টির পানিতে বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা আমদানি পণ্য ও জাহাজীকরণের জন্য থাকা রপ্তানি পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। অপরদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, অ্যাক্ট অব গডের আওতায় নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির দায় তারা নেবে না। এর প্রতিকার চেয়ে ব্যবসায়ীরা নৌমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন।

দেশের ৯৩ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এতে যাদের সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবাহিত হয়, তাদের প্রায় সবাই চিটাগং চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা আমদানি পণ্য ও রপ্তানির জন্য রাখা পণ্যভর্তি কনটেইনারে পানি প্রবেশ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এ চার সংগঠনের সভাপতি স্বাক্ষরিত একটি চিঠি নৌমন্ত্রী বরাবর দেওয়া হয়েছে। গত ১২ জুলাই স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে পানি প্রবেশ করায় পণ্যভর্তি কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব পণ্যের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি অস্বীকার, বর্জন ও প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি এ বিষয়ে দায় ও জবাবদিহি না করার অবস্থান জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত ও বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহৃত ভাষা ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি যদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সুনাম ক্ষুণœ হবে।

পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ চট্টগ্রামের পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বন্দরের কাছে পণ্য পাঠিয়েছি জাহাজীকরণের জন্য। এখন তাদের জিম্মায় ভিজে যাওয়ায় এ পণ্য ক্রেতা গ্রহণ করবে না। এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? বন্দরের ইয়ার্ডে পণ্য রাখার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ট্যারিফ বাড়িয়ে বাড়তি ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে। আমার পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্বও বন্দরের।’

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি প্রাকৃতিক মানলাম। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে ইয়ার্ডে পানি জমবে কেন? আর পানি জমার উপক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনারগুলো সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়নি কেন? কিংবা কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?’

গত ১০ জুলাই বন্দরের পরিচালকের (ট্রাফিক) স্বাক্ষরে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে সংরক্ষিত পণ্য, কার্গো ও কনটেইনারের কোনো ক্ষতির জন্য তারা দায়ী থাকবে না। সংস্থাটির দাবি, এটি ‘অ্যাক্ট অব গড’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঘটনা। ‘দি রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন ১৯৯(১৪) অনুযায়ী এ ধরনের ‘অ্যাক্ট অব গড’-জনিত ক্ষতির দায় থেকে কর্তৃপক্ষ অব্যাহতি পায়।

এ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সংস্থাটির সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘প্রথমত কোনো কনটেইনার না খোলা পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না কনটেইনারের ভেতরে থাকা পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, কনটেইনারের পণ্যে যদি কনটেইনারের ত্রুটির কারণে পানি প্রবেশ করে সেটার দায়ভার তো বন্দর নেবে না। তাই এগুলো নিয়ে অনেক বিশ্লেষণের বিষয় রয়েছে।’

বন্দর ব্যবহারকীদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, উনাদের অভিযোগটি নৌমন্ত্রী বরাবর করা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে আমাদের হাতে গতকাল (সোমবার) পর্যন্ত আসেনি। অভিযোগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলো পরিবহনের কাজ করে মূলত শিপিং কোম্পানিগুলো। এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. সালাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জাহাজের ভেতরে থাকা কোনো কনটেইনারের ছিদ্র দিয়ে যদি বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে তাহলে এর দায় কনটেইনার মালিকের। একইভাবে নষ্ট কনটেইনার দিয়ে যদি পণ্য পরিবহন করা হয় আর এতে যদি পণ্যের ক্ষতি হয় তাহলেও এর দায় কনটেইনার সরবরাহকারীর। তেমনিভাবে বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা কনটেইনারের ভেতরে যদি পণ্য নষ্ট হয় এবং যদি কনটেইনারটি ভালো থাকে তাহলে বন্দরকে এর দায় নিতে হবে।’

কনটেইনার নষ্ট না খারাপ এটি কে নির্ধারণ করবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এজন্য প্রয়োজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শিপিং এজেন্টের যৌথ সার্ভেতে নির্ধারণ হবে কার দায় কতটুকু। আপনি সার্ভে না করে তো অ্যাক্ট অব গড বলতে পারেন না?

বন্দরের ভেতরের ইয়ার্ডগুলোর সংস্কার প্রয়োজন জানিয়ে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘বৃষ্টিতে বন্দরের কোন কোন ইয়ার্ডে পানি জমে তা চিহ্নিত করে এগুলো সংস্কার করা দরকার। একই সঙ্গে বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও উন্নত করা প্রয়োজন। তবে যেভাবেই হোক টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এ সমস্যা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবারই ভূমিকা রয়েছে।

অ্যাক্ট অব গড কী? : প্রাকৃতিক কারণকে অ্যাক্ট অব গড বলা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের ‘দি রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন ১৯৯ অনুযায়ী সাত ধরনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় কর্তৃপক্ষ নেবে না। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ‘অ্যাক্ট অব গড’, ফোর্স মেজর, স্বাভাবিক ব্যবহারজনিত ক্ষয়, পণ্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যজনিত ক্ষতি এবং নির্দিষ্ট কিছু যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত ঘটনা। এসব কারণে পণ্যের ক্ষতি হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ এর দায় নেবে না।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। বন্দরের ইতিহাসে এক অর্থবছরে যা রেকর্ড। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ একক কনটেইনার। কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে বর্তমানে বিশে^র শীর্ষ ১০০ বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম। ২০২৪ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বখ্যাত শিপিং ম্যাগাজিন লয়েডস এ তালিকা করে। এর আগে ২০২৩ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিয়ে অবস্থান ছিল ৬৭তম, ২০২২ সালেও ৬৭তম, ২০২১ সালে ৬৪তম, ২০২০ সালে ৬৭তম ও ২০১৯ সালে ছিল ৫৮তম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত