ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশের ১০ প্রতিষ্ঠানের দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোতে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রম (এসটিআর-এসএআর) প্রতিবেদন আগের বছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে। তিনি জানান, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নজরদারি জোরদারের ফলে এ এসটিআর-এসএআর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান, বিএফআইইউর নির্বাহী পরিচালক ও উপপ্রধান ইমতিয়াজ আহমেদ মাসুম এবং সহকারী মুখপাত্র সাইদা খানম উপস্থিত ছিলেন।
বিএফআইইউ-প্রধান বলেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও ১০টি প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট মোট ১১টি অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলায় বর্তমানে যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। এসব মামলায় আদালতের নির্দেশে দেশে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও সংহত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৭-২৮ সালে শুরু হতে যাওয়া চতুর্থ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনকে সামনে রেখে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সঙ্গে এগমন্ট সিকিউর ওয়েব (ইএসডব্লিউ) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করছে, যা সীমান্তের বাইরে অর্থ পাচারবিষয়ক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক হিসাব স্থগিতের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইখতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কেবল সন্দেহজনক লেনদেন বা নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আইন অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়। একই ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে যে কারও বিরুদ্ধেই সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জমা পড়া ৩০ হাজার ১৯৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর)। মোট প্রতিবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি-তদারকি ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার উন্নতির প্রতিফলন।
বিএফআইইউ জানায়, প্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিবেদন জাতীয় তথ্যভান্ডার, কর, কোম্পানি নিবন্ধন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রয়োজন হলে বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন বা অন্য কোনো আর্থিক অপরাধের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে তদন্ত ও অনুসন্ধানের স্বার্থে বিভিন্ন দেশীয় সংস্থা থেকে ১ হাজার ৩২৯টি তথ্য চাওয়ার অনুরোধ পেয়েছে বিএফআইইউ। একই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন ১২১টি থেকে বেড়ে ২৫০টিতে এবং অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫টিতে উন্নীত হয়েছে।
বিএফআইইউর মতে, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বৃদ্ধি নেতিবাচক প্রবণতার নির্দেশক নয়; বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক নজরদারি, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং রিপোর্টিং সংস্থাগুলোর কমপ্লায়েন্স সংস্কৃতি সংহত হওয়ার ফলেই প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে দেশের সক্ষমতা আরও সংহত হবে।