আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

জননিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র ছাড় নয়

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম

খ্যাতিমান আমেরিকান ঔপন্যাসিক, গল্পকার ন্যাথানিয়েল হথর্ন বলেছিলেন, ‘নিরাপত্তা কেবল কোনো প্রাচীর বা অস্ত্র দিয়ে তৈরি হয় না, এটি মানুষের পারস্পরিক বিশ^াস ও আইনের শাসনে প্রতিষ্ঠিত হয়।’ আমরাও বিশ^াস করি, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনই কেবল একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র কিংবা সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু ১৬ জুলাই দেশ রূপান্তরে ‘৬ মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, এ দুইয়ের ঘাটতির কারণেই কি জননিরাপত্তার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে? দেশের নতুন প্রেক্ষাপটে জনমনে সংগতই প্রত্যাশা জেগেছিল, সমাজ জীবনের স্তরে স্তরে কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের রূপরেখা বাস্তবায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে শান্তি-নিরাপত্তা ও মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের পথ কণ্টকমুক্ত হবে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দিচ্ছে, জননিরাপত্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জনপ্রত্যাশাঅনুসারে এখনো নিশ্চিত হয়নি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন নারী ও শিশু। ছয় মাসে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন ৩৮৩ সাংবাদিক। ১৫ জুলাই সংবাদমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এই সূত্রের বরাত দিয়ে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব সহিংসতা, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। যেখানে, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হন। যেকোনো সরকারের কাছে আইনশৃখলার নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। আমরা জানি, রক্তস্নাত বাংলাদেশের আজকের প্রেক্ষাপটের পেছনের ইতিহাস মর্মন্তুদ। আর এ জন্যই প্রশ্নমুক্ত নিরাপত্তার জনপ্রত্যাশাটাও বেশি তুঙ্গে। এমতাবস্থায় আমাদের স্মরণে আসেন স্বনামধন্য ইংরেজ রাজনীতিবিদ অলিভার ক্রমওয়েল। তিনি বলেছেন, ‘জননিরাপত্তা এবং শান্তি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ তার পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে পারে না।’

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুন-খারাবি, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বার্তা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জননিরাপত্তা বিঘিœত হলে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে মানবাধিকারে অভিঘাত লাগে। আমাদের স্মরণে আছে জনশান্তি বিঘœকারীদের দুষ্কর্মের পথ রুদ্ধ করতে, মব সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রত্যয়ে এই সরকার যাত্রালগ্নেই কঠোর বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও সহিংসতায় বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং এর মধ্যে দলীয় অন্তর্কোন্দলের বিষয়গুলোও রয়েছে। আমরা  জানি, যেকোনো রাষ্ট্রে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশেরই অগ্রগণ্য ভূমিকা থাকে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রশ্ন দাঁড় করায়, যথাযথভাবে পুলিশের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এখনো কি অদৃশ্য কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে? আমরা মনে করি, অপরাধের হ্রাস টানতে, সমাজবিরোধীদের মূলোৎপাটনে, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে, অপরাধ জগৎ ভেঙে দেওয়ার প্রত্যয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি। অভিযান পরিচালনা কৌশলেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র উদাসীনতার অবকাশ নেই।

সরকারের প্রথম এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা প্রশ্নমুক্ত রাখা। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, নিরাপত্তা হলো জীবনরেখা। অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক অস্থিরতাই প্রত্যক্ষ কারণ নয় বলেও আমরা মনে করি, এ জন্য বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল করার ওপরও আমরা জোর দিই। আমাদের বিশ^াস, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নির্মোহ অবস্থান একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আইনের শাসন নিশ্চিত হলে অনেক ক্ষেত্রেই অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। টনক থাকলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এখনই নড়েচড়ে বসতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, মন্ত্রী থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান ও মুখপত্ররা ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে’ দাবি করে সন্তোষে ভোগেন। এ ধরনের দায়িত্বহীন সন্তোষে জনমনে অনাস্থা জন্মে। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত