ঘনঘটায় জীবনের জয়গান

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

কথা ছিল একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার। কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টির দেখা মেলেনি। তবে মেঘলা আকাশের নিচে বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকা জনসমুদ্রের মন ভিজেছে নাচের ছন্দ, গানের সুর আর মানবিক সংহতির আহ্বানে। বর্ষা-বন্দনার এই নৃত্যানুষ্ঠান যেন হয়ে ওঠে বাংলার চিরায়ত বর্ষার রূপ আর সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

‘আবারও ভিজবো একসাথে’ শিরোনামে গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় দ্বিতীয় বারে মতো আয়োজিত হলো বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা’। আয়োজনে ছিল অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমি। সহযোগিতায় ছিল চারুকলা অনুষদ। সকাল থেকেই বকুলতলায় জড়ো হতে থাকেন শিল্পী, অতিথি ও দর্শনার্থী। আগে থেকেই বলা ছিল ছাতা ছাড়াই দর্শনার্থীদের ভিজতে হবে একসঙ্গে। নারীদের নীল, সবুজ বা সাদা শাড়ি আর পুরুষদের পাঞ্জাবি পরিধানের অনুরোধ জানানো হয়। বেলা ১১টায় শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। মূলত বর্ষাকে বরণ করে নিতেই এই আয়োজন। বাংলার নানা গান, গল্প আর কবিতার সঙ্গে পা মেলান শিল্পীরা। তাদের ছন্দে উঠে আসে বর্ষাকথন।

এই আয়োজন শুধু বর্ষার উদযাপন নয়; বন্যাকবলিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারও। শত শত শিল্পীর সম্মিলিত পদচারণা আর হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে মুখর এই আয়োজন প্রমাণ করেছে বাংলার বর্ষা এখনো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে সুর, নৃত্য ও মানবতার অনন্ত বন্ধনে। পুরো আয়োজনজুড়েই পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যার্তদের জন্য অনুদান সংগ্রহ করা হয়, যা পৌঁছে দেওয়া হবে দুর্গত এলাকাগুলোয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে যেমন তহবিল সংগ্রহে অবদান রেখেছেন, তেমনি দর্শনার্থীরাও অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত জাগো ফাউন্ডেশনের বুথের মাধ্যমে বন্যার্তদের জন্য মুক্তহস্তে অনুদান দিয়েছেন।

বর্ষার আবহ ছড়িয়ে দিতে ৯০ মিনিটের এই বর্ণিল অনুষ্ঠানে মোট ১৬টি নৃত্য পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এসব পরিবেশনায় অংশ নেন তিনশ’র বেশি শিল্পী, যাদের বয়স ৩ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে । শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজকর্মী, সরকারি চাকুরে, গৃহিণীসহ নানা পেশার মানুষ এক মঞ্চে নেচে বর্ষাকে বরণ করেন। গত বছরের প্রথম ‘ঘনঘটা’ অনুষ্ঠানের দারুণ সাড়া-ই এবার আরও বড় পরিসরে এই মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনটি আয়োজন করতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান আয়োজকরা।

একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদ বলেন, ‘নগরজীবনে বর্ষা এখন অনেকের কাছেই জলাবদ্ধতা আর যানজটের প্রতীক। অথচ বাংলার সংস্কৃতিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষা উৎসবের অংশ। সেই সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন করে সামনে আনতেই এই আয়োজন। বর্ষাকে কীভাবে খোলা আকাশের নিচে উদযাপন করা যায়, সেটাই ছিল ইচ্ছে। গত বছর বৃষ্টি হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বছর বৃষ্টি হয়নি। তবে আমার ধারণা, শিল্পীরা তাদের পরিশ্রম ও নাচের মাধ্যমে দর্শকের মন ভিজিয়ে দিয়েছেন। মানুষ যেন বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও সুযোগ পায় আমরা এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি।’

বর্ষাবন্দনার এই অনুষ্ঠানের সর্বশেষ পরিবেশনা ছিল ‘আমরা সবাই রাজা’ ও ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ এই যুগল গানের সঙ্গে মনোময় নৃত্য। সব শিল্পীর পরিচয় পর্বের পর মধ্য দুপুরে বকুলতলায় অনুষ্ঠানের যতি টানেন অর্থি আহমেদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত