বন্যার পানি নেমে গেছে, পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোও পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তারপরও বন্যা উপদ্রুত এলাকার পরীক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিত করায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী। আর এই চ্যালেঞ্জের কথা খোদ শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন।
পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণার পর থেকে অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতিনিয়ত ফোন করছেন জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর জহুরুল হক স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এতে চট্টগ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যেমন মনোসংযোগের ব্যাঘাত ঘটবে তেমনিভাবে পরীক্ষার পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও তারা পিছিয়ে পড়বে। বুয়েট, মেডিকেলসহ বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা সময় কম পাবে।’
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিবের সঙ্গে একমত পোষণ করেন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজের এক প্রফেসরের সন্তান এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার সন্তান তো ঢাকা বা অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের মেধাবীদের চেয়ে পিছিয়ে যাবে। বুয়েটসহ অন্যান্য ভর্তি পরীক্ষার জন্য সে সময় কম পাবে। এতে আমার মেয়ের মতো চট্টগ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুধু ভর্তি পরীক্ষা নয় শিক্ষার্থীদের মনোসংযোগ ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ বলে জানান চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এতদিন আমরা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা দিলাম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। এতে অবশ্য শিক্ষার্থীদের মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটবে। তবে বন্যা উপদ্রুত এলাকার শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
কেন্দ্রগুলো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে কথা হয় বন্যা উপদ্রুত এলাকা সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা গত বৃহস্পতিবারে পজিটিভ রিপোর্ট দিয়েছি, আমার এলাকার আওতাধীন পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
একই মন্তব্য করেন বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি বলেন, আমার এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে এবং পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোও পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাটও ঠিক রয়েছে।
এবারের বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানেরও অনেক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার সময় পানিতে ডুবে গিয়েছিল সাতকানিয়া সরকারি কলেজকেন্দ্র। বর্তমানে কেন্দ্রের অবস্থা জানতে কথা হয় এ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু রায়হান মো. আশিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার কেন্দ্রে ৮৪০ পরীক্ষার্থী রয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কেন্দ্রের কক্ষগুলো পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ড থেকে যখন পরীক্ষা নিতে বলবে আমরা তখনই পরীক্ষা নিতে পারব।’
এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাঠান মো. সাইদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বন্যা উপদ্রুত এলাকার পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো পরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে শিক্ষা বোর্ড হয়তো পরীক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো স্থগিত করেছে।
পরীক্ষা পেছানোয় বোর্ডের চ্যালেঞ্জ কী? : এবার যেহেতু অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে তাই সব বোর্ডের জন্য একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হচ্ছে। এখন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের যত পরীক্ষা পেছানো হবে সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করতে হবে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর জহুরুল হক স্বপন বলেন, ‘প্রশ্ন নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। বিজি প্রেসে প্রশ্ন রয়েছে, শুধু প্রিন্ট করতে হবে। তবে তারপরও যত আগে পরীক্ষা শুরু করা যায় ততই ভালো।’
অতীতের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত যত এইচএসসি পরীক্ষা : উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই ও আগস্টে বন্যার কারণে দেশে বিভিন্ন সময়ে পাবলিক পরীক্ষা পেছানো হয়েছিল। এর মধ্যে গত বছর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা বন্যার কারণে একটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালে প্রবল বন্যার কারণে সিলেট বোর্ডে ৩০ জুন থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ১৭ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত, ২০০৪ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট এবং ১৯৯৮ ও ১৯৮৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষা দুই মাস করে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার যেহেতু অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হচ্ছে তাই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ইতিমধ্যে ৬টি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে এবং বাকি পরীক্ষাগুলোও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে, তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চিন্তা বাড়ছে।
শিগগিরই পরীক্ষার ঘোষণা আসতে পারে : গত ১৬ জুলাই আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয় বন্যা উপদ্রুত এলাকায় বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সার্বিক অবস্থা, পরীক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও রাস্তাঘাটের কথা বিবেচনা করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। পরীক্ষার সংশোধিত সময়সূচি পরে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, পরীক্ষা পরিচালনার জন্য অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে আমরা শনিবার আবারও আলোচনায় বসব। যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা আবারও শুরু করা যায় আমরা সেই উদ্যোগ নেব।
কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার পর আবারও নতুন করে শুরু করতে তো পরীক্ষার্থীদের সময় দিতে হবে। এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনির্দিষ্ট নয় পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। তবে আমরা পর্যাপ্ত সময় দিয়েই পরীক্ষা শুরু করব।
এদিকে ইতিমধ্যে যেসব পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে সেগুলো হলো ৮ জুলাইয়ের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ও ১১ জুলাইয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি, ১৩ জুলাইয়ের পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র, ১৫ জুলাইয়ের পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র, ১৬ জুলাই ভূগোল প্রথম পত্র ও ১৮ জুলাই ভূগোল দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা ছিল।
উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই থেকে সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ৯২ হাজার ৯০৫ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১১৪টি কেন্দ্রে ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলার ৬৮ কেন্দ্রে ৭০ হাজার ৯৭৪ জন, কক্সবাজারের ১৮টি কেন্দ্রে ১২ হাজার ২৫৫ জন, রাঙ্গামাটি জেলার ১০টি কেন্দ্রে ৫ হাজার ৪৩৯ জন, খাগড়াছড়ি জেলার ১০টি কেন্দ্রে ৭ হাজার ৩৫৩ জন ও বান্দরবান জেলার ৮টি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৬৭ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন।