নীতিমালা উপেক্ষায় ঝুঁকিতে আকাশপথ

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

আকাশপথের নিরাপত্তায় দেশে নীতিমালা থাকলেও মানা হচ্ছে না নিয়ম। প্রভাব খাটিয়ে অনেক কিছু বদলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রশিক্ষণ বিমান ওঠানামা করতে না পারলেও বাংলাদেশে এটি খুব স্বাভাবিক দৃশ্য। দেশের সব বিমানবন্দরের আশপাশ ছেয়ে আছে উঁচু ভবনে। মাঝেমধ্যে এই অনিয়ম নিয়ে কথা হয়, তবে শেষপর্যন্ত চিঠি চালাচালিতেই থেমে যায় কর্র্তৃপক্ষের তৎপরতা। উত্তরা দিয়াবাড়ী মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গেল বছরের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ে শিক্ষার্থীসহ ৩৫ জনের করুণ মৃত্যুর পরও দেখা গেছে এমন দৃশ্য। বেশ কয়েকটি সংস্থা তদন্ত করে কিছু সুপারিশ করলেও তা উপেক্ষিত থেকে গেছে।

বিমানবন্দর-সংলগ্ন দলিপাড়া, বাউনিয়া ও পাকুরিয়া এলাকায় ৬৪২টি উঁচু ভবন থাকলেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) তা সরাতে পারছে না। বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করতে সংশ্লিষ্ট সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানানো হলেও তা ঠেলাঠেলিতেই সীমাবদ্ধ আছে। তাছাড়া দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখার সুপারিশও আমলে নেওয়া হয়নি। এসব নিয়ে বেবিচকের কর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাধানের অভাব তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। দুর্ঘটনার পরপরই তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। তাছাড়া আলাদাভাবে আরও কয়েকটি সংস্থাও তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়ে নানা সুপারিশ করে। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটিতে একটি মাত্র বের হওয়ার পথ বা সিঁড়ি ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হয় ঠিক সেই সিঁড়ির সামনে। এ কারণে প্রাণহানি বা হতাহত বেশি হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতার সীমা লঙ্ঘনকারী অসংখ্য স্থাপনা থাকার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা ঠিক হচ্ছে না। শাহজালাল যখন চালু হয় তখন চারপাশে তেমন জনবসতি ছিল না, কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিনিয়ত বিমান ওঠানামার ফলে এই এলাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের বাইরে সরিয়ে নিয়েছে। আমাদেরও তা ভাবতে হবে। সক্রিয় বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমানের ওঠানামা বন্ধ করা আরও বেশি জরুরি। বিমানবন্দরের আশপাশে আর যেন উঁচু ভবন তৈরি হতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’

বেবিচক-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, মাইলস্টোন দুর্ঘটনা দেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। তবে আলোচিত ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভবন বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। সেখানে গত বছরের দুর্ঘটনার কারণ ছিল ভিন্ন। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের সুউচ্চ অনেক ভবন উড়োজাহাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমানের অনিয়ন্ত্রিত ওঠানামা বন্ধ করা এবং রানওয়ের চারপাশে নীতিবহির্ভূত বহুতল ভবন অপসারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ‘ঠেলাঠেলি’ ও আইনি মারপ্যাঁচে আটকে আছে। ঝুঁকিপূর্ণ ৬৪২টি ভবন চিহ্নিত করা হলেও তা অপসারণে কোনো গতি নেই।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাইলস্টোন কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পরও আমরা সচেতন হইনি। প্রশিক্ষণ বিমান এখনো ওঠানামা করছে। উত্তরার দিয়াবাড়ী, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরে উঁচু ভবন থাকলেও বিমান ওঠানামায় সমস্যা হবে না। তবে বিমানবন্দরের আশপাশে অনেক উঁচু ভবন আছে। আমরা সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েও বাগে আনতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ বিমানের ঘন ঘন ওড়ার কারণে ঢাকার আকাশসীমায় এক ধরনের কৃত্রিম জটলা তৈরি হচ্ছে। ফলে বৈরী আবহাওয়া বা জরুরি মুহূর্তে কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে দ্রুত অবতরণ করানো বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের কোনো আধুনিক ও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এভাবে কমার্শিয়াল ফ্লাইটের সঙ্গে প্রাথমিক স্তরের প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনার নজির নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিমানবন্দরের চারপাশের আকাশপথ নিরাপদ রাখার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট উচ্চতা সীমা বা অবস্টাকল লিমিটেশন সারফেস নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

বেবিচক সূত্র জানায়, নিয়মের মধ্যে থাকার কথা বললেও বেবিচকই অনেক সময় আইন মানছে না। সংস্থাটির সদরদপ্তরই দুটি বেজমেন্টসহ ১১তলা উঁচু ভবন। বছর চারেক আগে এই ভবনে তাদের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে উত্তরা ১ নম্বর সেক্টর-ঘেঁষা তৃতীয়তলায় বেবিচকের কার্যক্রম চলছিল। সংস্থাটির সদর দপ্তরের সঙ্গেই সেন্টার পয়েন্ট নামে একটি শপিংমল ও সিনেমা হলের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এ ভবনটিও আটতলা। শাহজালালের অভ্যন্তরেই এই দুটি উঁচু ভবন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বেবিচকের কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।

উত্তরা ১,৫, নম্বর সেক্টর, দলিপাড়া, উলুদাহা, চলভোগ, পাকুরিয়া ও খিলক্ষেতসহ আরও কিছু এলাকার উঁচু ভবনও বিমান চলাচলের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব এলাকায় খুব নিচে দিয়ে উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। ফলে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা বৈমানিকের ভুল সিদ্ধান্তে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অ্যানেক্স-১৪ নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এমন এলাকা নির্বাচন করতে হবে, যা জনবসতি থেকে দূরে, শব্দদূষণ কম এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমাতে উপযোগী। বেবিচকের নিজস্ব নীতিমালাতেও এ নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে জনবহুল এলাকায় প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। তাছাড়া ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও একাধিক নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।

বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি এয়ারওয়েজ যাত্রীবাহী বিমান সার্ভিস দিচ্ছে। এ ছাড়া ১০ থেকে ১২টি বিমান সংস্থা কার্গো বিমান ও হেলিকপ্টার সার্ভিস পরিচালনা করছে। প্রতিদিন ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করছেন এই বিমানবন্দর দিয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত