চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় চাঁদা তুলে ‘প্রতিমাসে তিন লাখ টাকা দিতে হয়’ বলে স্বীকার করেছেন পুলিশের ‘ক্যাশিয়ার’ নামে খ্যাত পুরাতন ব্রিজঘাট এলাকার বাসিন্দা মো. আবদুস সবুর। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠত। এখন ৫ লাখ টাকার বেশি উঠে না। তার মধ্যে থানায় ৩ লাখ টাকা দিতে হয়। সাংবাদিকসহ আরও অনেককে টাকা দিতে হয়। আমার হাতে তেমন কিছু থাকে না।
কর্ণফুলী থানার ‘ক্যাশিয়ার’ প্রথা নতুন কিছু নয়, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলছে এ অবস্থা। আওয়ামী সরকার আমলের পুলিশের সোর্স পরিচয়ের লোকজন বাদ পড়লেও পুলিশের সখ্যতায় টিকে আছেন এক সময়ের ডাব বিক্রেতা আবদুস সবুর। কখনো পুলিশের ক্যাশিয়ার, কখনো গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সোর্স, আবার কখনো নৌ-পুলিশ বা কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি পরিচয়ে চলছে তার চাঁদাবাজি। যদিও পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থানায় ‘ক্যাশিয়ার’ নামে কোনো পদ নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, জাহাজ ও ট্রলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ব্যবহার করে এই চক্র মাসে লাখ লাখ টাকা আদায় করছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে চাঁদা দেন তারা। অবশ্যই পুলিশ বলছে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের পট পরিবর্তনের আগে থানার ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে কামাল মেম্বারসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি করতেন। ওই সময় সেই চক্রে আবদুস সবুরও সহযোগী হিসেবে ছিলেন। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসীর পক্ষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে কৌশলে কামাল মেম্বার ও তার সহযোগীরা সটকে পড়েন। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর পুলিশের ঘনিষ্টতায় সেখানে ঢুকে পড়েন আবদুস সবুর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন বিভিন্ন ঘাটে জাহাজ থেকে চোরাই তেল, স্ক্র্যাপ, গম, চিনি, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মাদক কারবার, জুয়ার আসর, অবৈধ তেল ব্যবসা এবং নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মাসের নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দিলে পুলিশি হয়রানি, মিথ্যা মামলা কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় বাধার ভয় দেখানো হয়। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কর্ণফুলীতে ব্যবসা করতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে কখন কী হয়রানির শিকার হতে হবে, সেই ভয় সবসময় কাজ করে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, বয়সের কারণে আবদুস সবুর আগের মতো সরাসরি না গেলেও তার পরিবর্তে সাকিব নামের এক যুবক বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করেন। সাকিব স্থানীয়ভাবে সবুরের নাতি হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ আছে, তিনি নিজেও পুলিশের সোর্স বা ক্যাশিয়ার পরিচয় দেন।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার চরপাথরঘাটা, পুরাতন ব্রিজঘাট, ইছানগর, বাংলা বাজার ঘাট, বিএফডিসি গেট, শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাড়, শিকলবাহা, জুলধা, ফকিরনীর হাট, দারোগার হাট, ডাঙ্গারচরসহ অন্তত শতাধিক স্পট থেকে নিয়মিত এভাবে চাঁদা আদায় করা হয়।
জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, আমি থানায় নতুন এসেছি। এই নামে কোনো ক্যাশিয়ার আছেন কি না, তা এই মুহূর্তে জানি না। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখব। আর যদি কেউ থানার নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে থাকেন তাহলে তাকে আটক করে থানায় খবর দিন। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, থানায় ক্যাশিয়ার প্রথা থাকার কথা না। প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে একজন ওসি অবৈধ টাকা গ্রহণ করা খুবই অনৈতিক। টাকার বিনিময়ে অবৈধ কাজকে বৈধ করা হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তাই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে খুবই দায়িত্বশীল হতে হয়। দুর্নীতি বন্ধ করার বদলে নিজে অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়ালে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মাদারীপুরে আলোচিত লামিয়া হত্যা মামলার ৩ আসামি গ্রেপ্তার
ইরানি হামলায় আহত শতাধিক মার্কিন সেনা