পশ্চিম এশিয়ার ভারসাম্য বদলাচ্ছে!

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ এএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল অনেক দিন ধরেই অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত। চলমান এই যুদ্ধের মধ্যেই অঞ্চলটিতে নিজেদের অন্যতম মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে এক বিরল পরমাণু চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে সৌদি আরব। তবে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব পরমাণু চুক্তি ওয়াশিংটনের আরেক মিত্র ইসরায়েলের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটি বলছে, এই চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দিতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভারসাম্য বদলে ভূমিকা রাখতে পারে এই চুক্তি।

গত বুধবার ঘোষিত এই চুক্তি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর লক্ষ্য হলো সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি উন্নয়নের সুযোগ করে দেওয়া। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন ‘তেল আবিবকে পাশ কাটিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যে চুক্তি করা হচ্ছে, তা গুরুতর কৌশলগত ব্যর্থতা। এটি আমাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।’ তিনি আরও বলেন, সৌদি ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যান বলেন, সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রে রূপ নিতে পারে। এটি পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করবে। ইসরায়েলকে অবশ্যই এই চুক্তির বিরোধিতা করতে হবে। পাশাপাশি চুক্তি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে তদবির চালাতে হবে। এই চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের অন্যতম কারণ পশ্চিম এশিয়ায় একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। সাবেক প্রতিরক্ষাপ্রধান বেনি গ্যান্টজ বলেন, একটি মধ্যপন্থি আঞ্চলিক জোট গঠনের পদক্ষেপের সঙ্গে এই বিষয়টিকে সমন্বয় না করে সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা তৈরি করা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য ভালো এমন কথা কোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তাই বলবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় থেকেই সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে এত দিন কোনো চুক্তি হয়নি। এর একটি কারণ ছিল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সতর্কবার্তা। এসব সংগঠন বলেছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে যেতে পারে। ইসরায়েলিরাও আশা করেছিল, সৌদি আরবের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার অংশ হবে। বাইডেনের পরিকল্পনাতেও এমন উদ্যোগের কথা ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৌদির এই চুক্তিতে তেমন কোনো পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এক বিবৃতিতে বলেন নিশ্চিত থাকুন, এই চুক্তি পারমাণবিক নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই সহযোগিতার পাশাপাশি একটি ‘দ্বিপক্ষীয়’ সুরক্ষাচুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এই দুই চুক্তি কয়েক দশকব্যাপী শত শত কোটি ডলারের অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই সহযোগিতা চুক্তির ফলে সৌদি আরবের পারমাণবিক শক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। সৌদি সরকারও এক বিবৃতিতে এই চুক্তির খবর নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, এটি জ্বালানি খাতে দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতারই একটি অংশ। এই পরমাণু চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি যৌথ সমীক্ষা শেষে সৌদি আরবকে তাদের মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এর ফলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থেকেই নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত