টরন্টো পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০২ পিএম

চারপাশে গাছে গাছে আকুতিভরা উচ্ছ্বাস। শরতের হিমমাখানো তিরিতিরি বাতাসে ঝরাপাতার অলস উৎসব। প্রকৃতি যেনো বুনন করেছে বৈভবের রঙ। উদ্যানময় আলোছায়ার লুকোচুরি। ইতিউতি খাওয়া পাখিদের উড়াউড়ি। কিচিরমিচির ডাক। সব মিলিয়ে রুপ নেয় ভ্যানগগের অন্তর্ভেদী ক্যানভাসে। তারও সাথে থেকে থেকে হাওয়ায় ভেসে আসে নাম না জানা বনফুলের গন্ধ। খোলাকাশের নীচে আরণ্যক পার্কের চারপাশে তাকালেই বিশ্ব নন্দিত ফরাসী লেখক আলবেয়ার কাম্যুর সেই বিখ্যাত উক্তিটির কথা মনে পড়ে যায় ‘শরৎ হচ্ছে দ্বিতীয় বসন্ত যেখানে পাতারা ফুল হয়ে ধরা দেয়’।  মূর্ত-বিমূর্ত এসবকে সঙ্গী করে একের পর এক স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবিরা। এক ভাষায় নয়, বহুভাষায়। ২০২৪ থেকে শুরু, প্রতি বছরের আয়োজন টরন্টো পোয়েট্রি ফ্যাস্টিভ্যাল বা টরন্টো কবিতা উৎসব। 

একটি প্লেটে রাখা সবজি সালাদে কোনটি শশা, পিয়াজ, কাঁচা মরিচ, টমাটো কিংবা ধনিয়া পাতা যেমন আলাদা আলাদা চেনা যায় ঠিক তেমনই কানাডার জাতিগত ধরণ। আদিবাসী-অভিবাসী। আদিবাসীদের রয়েছে বিভিন্ন স্বতন্ত্র স্বত্ত্বা ও সংস্কৃতি ঠিক তেমনই অভিবাসীদের। খোপ খোপ মোজাইক নিয়ে যেভাবে একটি ঘরের মেঝে তৈরী হয় সেইরকম বহু সংস্কৃতি ও জাতীয়তা নিয়ে কানাডা সাংবিধানিকভাবে একটি মোজাইক সংস্কৃতির দেশ। দেশটির জাতীয়তার পরিচয় হাইপেনড নেশন অর্থাৎ যিনি বাংলাদেশ থেকে কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহন করবেন তিনি বাংলাদেশী-কানাডিয়ান। ইন্ডিয়া থেকে ইন্ডিয়ান-কানাডিয়ান। ইটালী থেকে ইটালিয়ান-কানাডিয়ান, অভিবাসীরা এককভাবে শুধুমাত্র কানাডিয়ান হবেন না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ‘মেল্টিং পট‘ নয়। 

কানাডা বাংলাদেশের প্রায় ৬৪ গুণ বড় কিন্তু জনসংখ্যায় প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগ। ১৩টি প্রদেশ এবং ৩টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল নিয়ে কানাডার কনফেডারেশন গঠিত হয় ১৮৬৭ সালের ১ জুলাই। সেই থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।

পৃথিবী খ্যাত টরন্টো যদিও কানাডার রাজধানী নয় কিন্তু সবচেয়ে বড় শহর এবং ওন্টারিও প্রদেশের রাজধানী। প্রায় ২৫০টিরো বেশী জাতিস্বত্তা এবং ১৬০টিরো বেশী ভাষাভাষী  জনগনের বসবাস এই ইমিগ্র্যান্ট সিটিতে। ফলে বিশ্বের অনেক জাতিস্বত্তার সাংস্কৃতিক বিনিময় মিথস্ক্রিয়ার এক উর্বর বৈচিত্র্যময় জনপদ এই শহর। পৃথিবীর বহু কৃতি শিল্পী, লেখক এবং কবির বসবাস ইতিহাস সমৃদ্ধ টরন্টোয়।

বেশ অল্প সময়েই টরন্টো পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠছে জনপ্রিয়, বছরের কাংখিত অনুষ্ঠান আর এসব কারণেই উৎসবটি জনমানসের মনযোগ আকর্ষণ করছে। টরন্টো পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল নিয়ে আগ্রহের সীমারেখো শুধুমাত্র ক্রস কানাডায় নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবিদের কাছেও।

মোজাইক কালচার বা খন্ড খন্ড সংস্কৃতি কানাডায় সংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও সম্প্রতিক কালে একটি বিতর্ক বেশ জোড়ালো ভাবে চলছে। তা হলো  কানাডার এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময়তা কি সমাজে এক ধরণের বিচ্ছিনতা বোধ তৈরী করছে? এর ফলে কি কানাডার শিল্প সাহিত্যে নিজস্ব চরিত্র গড়ে উঠছে না? এই চিন্তা ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্ট কানাডায় অফিসিয়াল ভাষা দুটি। ইংরেজী ও ফরাসী। স্কুল কলেজ অফিস আদালতে ভীষণ দাপট ভাষা দুটির। 

একজন অভিবাসী যখন কানাডায় আসে সাথে করে শুধুমাত্র বাক্স পেটরা নিয়েই আসে না। মনে ও মগজে, বুক ভরে নিয়ে আসে স্বদেশ, সংস্কৃতি ও তার ভাষা। আর ভাষা মানেই তো বহতা নদী। স্রোতস্বিনী। একেক ভাষার অনুরনন একেক বকম। ভাষার যেমন ঝংকার আছে তেমনই আছে ভাষার হুংকার। টরন্টো পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল সংখ্যাগুরু ভাষার কবিদের সাথে সংখ্যালঘু ভাষার কবিদের এক অনন্য সেতু বন্ধন। আর এই পারষ্পরিক মৈত্রী, যোগসূত্র একজন কবির মননের ভূগোল বিস্তৃত করে। এ আয়োজন প্রান্তিকতা ভাঙ্গার।

টরন্টো পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যাল কোন সুনির্দিষ্ঠ একটি ভাষার কবিতা উৎসব নয়। এখানে বহুভাষার কবিরা বহুভাষায় কবিতা পড়েন। বছরের একটি দিনে একত্রিত হন, আড্ডা দেন, পরিচয় ঘটে একে অপরের সাথে। এটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও সংস্কৃতির সম্মিলনের একটি প্ল্যাটফরম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত