প্রচ্ছদ রচনা

কথাসাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে একটি ঘটনা। ইংরেজি phenomenon শব্দটির যুৎসই বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না বলে ‘ঘটনা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হলো। ১৯৮০ দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তার যে উত্তঙ্গু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা বিস্ময়কর। হুমায়ূন আহমেদ সেই সব বিরল প্রতিভাধর সাহিত্যিকদের একজন যিনি জীবদ্দশায় দেশবাসীর কাছে ব্যাপকতম স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ‘কাল নিরবধি’ বলে ভবভূতির ন্যায় তাকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়নি। বাংলাদেশের মতো নিষ্পাঠক ও নিম্নআয়ের দেশে জীবদ্দশায় তিনি সংবৎসরে নবপ্রকাশিত গ্রন্থের লক্ষ কপি বিক্রি হতে দেখে গেছেন। তার প্রকাশক দেড়-দু মাসের পরিসরে দশটি সংস্করণ করতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠেছেন। জনবন্দনার পরিমাপে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি তুলনারহিত একক পুরুষ।

সম্প্রতি কলকাতার রাহুল দাশগুপ্ত নামে এক ভদ্রলোক ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০১৫ কালপর্বে প্রকাশিত এক সহস্র বাংলা উপন্যাসের একটি নির্দেশিকা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বাংলা উপন্যাসকোশ নামীয় উক্ত গ্রন্থটিতে হুমায়ূন আহমেদ নামে কারও অস্তিত্বমাত্র নেই। বস্তুত খোদ বাংলাদেশেই তাকে বাতিল করে দেওয়ার মতো লোকের অভাব ছিল না। এখনো নেই। বাঙালি কঠিন জাতি : ‘আগে পড়িতাম এখন আর পড়ি না’, বা ‘না হে, পড়ার মতো বই তিনি আর লিখিতেছেন না’ দীর্ঘশ্বাসবাহিত এসব ঋণাত্মক কথা এ শতাব্দী শুরু থেকে প্রায়শ কানে এসে যেত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ তার রচনাকে ‘অপন্যাস’ বলে গভীর তৃপ্তির পৈশাচিক হাসি হেসেছিলেন। এই বদরসিকতার কথার কথা ছেড়ে দিলেও অনস্বীকার্য যে, সমসাময়িক কালে অনেক প্রবীণ সাহিত্যিক-সমালোচক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান সম্পর্কে সন্দিগ্ধ ছিলেন। তাদের বিশ্বাস হুমায়ূন আহমেদের রচনায় পর্যাপ্ত ‘গভীরতা’ নেই, নেই ‘মননশীলতা’ কি ‘ভাবকুতা’, গ্যোয়েটে কথিত ‘মহৎ বিষয়’ নেই, নায়কের মস্তিষ্কে প্রবহমান ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেসের’ ধারাভাষ্য নেই, নেই কোনো ‘কাফকায়েস্ক’ জগতের অমানুষিক অসহায়ত্ব। এমনকি আদ্যিকালের ফ্রয়েডিয় মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান পর্যন্ত অনুপস্থিত। নাক টিপলে দুধ বের হয় এমন কবি-সাহিত্যিককেও বলতে শুনেছি, ‘পুনরাবৃত্তির চক্রজালে তার কল্পনাশক্তি আটকে গেছে।’

কীরকম প্রেরণা থেকে হুমায়ূন আহমেদ গল্প-উপন্যাস লিখেছেন সে প্রশ্ন সংগতভাবেই উত্থাপিত হতে পারে। তার উপন্যাসে কোনোরূপ উদ্দেশ্যমূলকতা প্রত্যক্ষ হয় না। পাশ্চাত্যের উপন্যাস তাকে প্রভাবান্বিত করেনি। কথাসাহিত্যের জাদুকর এই লেখক কখনোই পুরাণের দ্বারস্থ হননি, শাসকবর্গ বা রাজনীতি নিয়ে সবিশেষ মাথা ঘামাননি। জীবনের শেষ পর্বে কখনো কখনো তিনি ইতিহাসের কাহিনি অবলম্বন করেছেন বটে কিন্তু তা শুদ্ধ অবলম্বনই বটে—তিনি উপন্যাসের চৌহদ্দিতে ইতিহাস রচনা করতে বসেননি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লিখেছেন তিনি। কিন্তু তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়—তিনি লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনি, বাস্তুচ্যুত ও নির্যাতিত মানুষের কাহিনি। মানুষই তার উপজীব্য; মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণ ও সুখ-দুঃখের বয়ানই তার গল্প ও উপন্যাসের প্রধান উপাদান। তার কাহিনি সামাজিক মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গ্রন্থিত হয়ে ওঠে। মনে হয় লেখক একটি দাবার ছকে গুটিগুলো সাজিয়ে দিয়ে সটকে পড়েছেন; অতঃপর লেখকসৃষ্ট বিভিন্নরূপ চরিত্রগুলোর জীবনযাপনের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়া ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে। এই সূত্রে তার মধ্যাহ্ন উপন্যাস থেকে লাগসই একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। 
মধ্যাহ্ন শুরু হয়েছে সোহাগগঞ্জ বাজারের পাটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হরিচরণ সাহার সমাজচ্যুতির কাহিনি দিয়ে। নিজ বাড়ির ঠাকুরঘরে মুসলমান ছেলেকে প্রবেশকাধিকার দেওয়ার অপরাধে তিনি সমাজচ্যুত হয়েছেন। এক সন্ধ্যায় তিনি মাওলানা ইদ্রিসের বাড়ি এসেছেন :

মাওলানা হারিকেন হাতে বের হয়ে এলেন। চাদর গায়ে হরিচরণ দাঁড়িয়ে আছেন। একহাতে বেতের একটা লাঠি। অন্য হাতে হারিকেন। সঙ্গে আর কেউ নেই।

কেমন আছেন মাওলানা সাহেব?

জি জনাব, ভালো। আপনি এত রাতে!

রাত তো বেশি হয়নি। আপনি কি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছেন?

মাওলানা বললেন, সামান্য ভয় পেয়েছি। আমার কাছে কোনো বিশেষ কারণে কি এসেছেন?

হরিচরণ বললেন, ছোট্ট একটা কারণ আছে। শুনেছি আপনি পুরো কোরান শরীফ মুখস্থ করেছেন, এটা কি সত্য?

মাওলানা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। লজ্জিত গলায় বললেন, হাফেজ টাইটেল এখনো পাইনি। কোনো বড় মাদ্রাসায় গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। যেমন ধরেন দেওবন্দ মাদ্রাসা।

পরীক্ষা দিতে যান না কেন?

খরচপাতি আছে। আমি দরিদ্র মানুষ। অর্থের সংস্থান নাই।

হরিচরণ বললেন, আমি খরচ দিলে কি যাবেন?

মাওলানা চুপ করে রইলেন।

হরিচরণ বললেন, আপনাদের ধর্মে কি আছে যে অমুসলমানের সাহায্য নেওয়া যাবে না?

এ রকম কিছু নাই।

তাহলে আমার সাহায্য নিন। দেওবন্দ থেকে ঘুরে আসুন।

জি আচ্ছা। বহুত শুকরিয়া।

হরিচরণ সামান্য ইতস্তত করে বললেন, যদি কিছু মনে না করেন একটা অনুরোধ কি করতে পারি?

মাওলানা বললেন, অবশ্যই।

আপনার মুখস্থবিদ্যার একটা নমুনা কি আমাকে শোনাবেন?

মাওলানা বললেন, অবশ্যই। অজু করে আসি।

অজু করতে হবে?

জি। নাপাক অবস্থায় কোরান মজিদ আবৃত্তি করা ঠিক না।

হরিচরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মাওলানা ইদরিস জায়নামাজে বসে কোরান আবৃত্তি করছেন। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

এক সময় কোরানপাঠ শেষ হলো। মাওলানা বললেন, খিচুড়ি পাক করেছি। আপনি কি আমার সঙ্গে খানা খাবেন?

অমুসলিমকে খানা খাওয়াতে আপনাদের কোনো সমস্যা নাই?

জি না। সমস্যা কী জন্য থাকবে?

আপনাদের ধর্মের এই জিনিসটা ভালো। আমি আগ্রহের সঙ্গে খানা খাব। একজনের জন্য রেঁধেছেন। দুজনের কি হবে?

বেশি করে রেধেছি। যেটা বাঁচে সেটা দিয়ে সকালে নাশতা করি।

হরিচরণ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন। হাত ধুতে ধুতে বললেন, আরাম করে খেয়েছি। ধন্যবাদ।

পাঠক লক্ষ করেছেন, এখানে লেখক সর্বাংশে অনুপস্থিত। দুজন মানুষের সংলাপের মধ্য দিয়ে ঘটনা ফুটে উঠেছে, চিত্রিত হয়েছে তাদের চারিত্র্য। একই সঙ্গে সামাজিক প্রেক্ষাপটও তীক্ষ্ণতার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। সংলাপ নির্ভরতার কারণে এক দিকে স্বল্প ক্যানভাসে বড় ছবি আঁকা সম্ভবপর হয়েছে, অন্যদিকে বর্ণনা হয়েছে চাক্ষুষ।

মানব মনের জটিল ও রহস্যময় দিকের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে একজন কথাসাহিত্যিক নানাবিধ চরিত্র সৃষ্টি করেন। লেখকেরা সাধারণত এই জটিলতার ব্যাখ্যা দিতে অভ্যস্ত; তারা ঘটনার কার্যকারণ অনুসন্ধানে আগ্রহী। তাতে রচনার পরিধি বৃদ্ধি পায়। হুমায়ূন আহমেদ এই দায়িত্বটি পাঠকের জন্য নিরঙ্কুশভাবে সংরক্ষণ করেছেন। ঘটনার ময়নাতদন্তে না-গিয়ে তিনি সেসব ঘটনা উপজীব্য করেছেন যেগুলো পূর্বজদের রচনায় কখনো স্থান লাভ করেনি। তিন শতাধিক গল্প-উপন্যাসের গ্রন্থে তিনি বিচিত্র সব চরিত্র অংকন করেছেন। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের রসবোধ তীক্ষ্ণ। এই রসবোধের প্রমাণ হিসাবে দেয়াল উপন্যাসটি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের একটি বিষয়ে সংশয় ছিল আর তা হলো তার হত্যাকাণ্ডের পর কাকে প্রধান করে পরবর্তী সরকার গঠন করা সম্ভব হবে। জনশ্রুতি আছে নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, কামারুজ্জামান প্রমুখ অনেকের কাছেই প্রস্তাব করা হয়েছিল—তারা রাজি হননি। অতএব ১৫ আগস্ট সকালে মেজর রশীদ পুরনো ঢাকা শহরের আগা মসিহ লেনে গিয়েছিলেন খন্দকার মোশতাককে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে। খন্দকার মোশতাক এবং মেজর রশিদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছিল তা কেউ শোনেনি। দেয়াল উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে এই কথোপকথন কল্পনা করেছিলেন তা প্রণিধানযোগ্য :

সিঁড়িতে বুটজুতার শব্দ হচ্ছে। খন্দকার মোশতাক একমনে দোয়ায়ে ইউনুস পড়তে লাগলেন। এই দোয়া পাঠ করে ইউনুস নবী মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তার বিপদ ইউনুস নবীর চেয়ে বেশি।

দরজা খুলে মেজর রশীদ ঢুকলেন। তার হাতে স্টেনগান। তার পেছনে দুজন সৈনিক। তাদের হাতেও স্টেনগান। সৈনিক দুজন স্টেনগান মোশতাকের দিকে তাক করে আছে।

মোশতাক নিশ্চিত মৃত্যু ভেবে আল্লাহপাকের কাছে তওবা করলেন।

মেজর রশীদ বললেন, ‘স্যার চলুন।’

মোশতাক বললেন, ‘কোথায় যাব?’

‘প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। প্রথমে রেডিওস্টেশনে যাবেন। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।’

‘ট্যাংক এসেছে কেন?’

‘প্রেসিডেন্টের মর্যাদা রক্ষার জন্যে ট্যাংক এসেছে।’

মোশতাক বললেন, ‘শুক্রবারে আমি জুম্মার নামাজের আগে কোনো কাজকর্ম করি না। দায়িত্ব যদি গ্রহণ করতে হয় জুম্মার নামাজের পর।’

মেজর রশীদ কঠিন গলায় বললেন, ‘আপনাকে আমি নিতে এসেছি, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। অর্থহীন কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই।’

মোশতাক বললেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই। তবে আমাকে কিছু সময় দিতে হবে।’

‘আপনাকে কোনো সময় দেওয়া হবে না।’

‘কাপড় চেঞ্জ করার সময় দিতে হবে। আমি নিশ্চয়ই লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেব না?

এই অংশটি যে যারপরনাই কৌতুকাবহ তা ব্যাখ্যা করা অনাবশ্যক। হুমায়ূন আহমেদ জানেন পাঠক এবম্বিধ কৌতুকচিত্র উপভোগ করতে ব্যর্থ হয় না। এ প্রসঙ্গে মহামতি অস্কার ওয়াইল্ডের একটি প্রবচন স্মরণীয়। লেখককুলের উদ্দেশ্যে তার উপদেশ ছিল : ‘পাঠকের নিকট সত্য তুলিয়া ধরিতে চাহিলে তাহাদের হাসাইয়া দিন। নচেৎ তাহারা আপনাকেই শেষ করিয়া দেবে।’

কৌতুক ও নাটকীয়তা উপন্যাসকে উপভোগ্য করে তোলে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নানাবিধ নাটকীয় ঘটনায় পরিকীর্ণ। কিন্তু তার কলমে নাটকীয়তা কখনই অতি নাটকীয়তায় পর্যবসিত হয়নি। 

পৃথিবী রূপ বোঝাতে গিয়ে কোনো চিত্রশিল্পী রঙ-তুলি নিয়ে পুরো পৃথিবীর ছবি আঁকতে বসে যান না; সহস্র দৃশ্যপট থেকে বাছাই করে তিনি কয়েকটি দৃশ্যপট তৈরি করেন মাত্র। লীলাবতী হুমায়ূন আহমেদের একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। সিদ্দিকুর রহমানের কন্যা লীলবতী আজন্ম মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছে। লীলাবতী এখন বড় হয়েছে। দূর সম্পর্কের মামাকে সঙ্গে নিয়ে সে বাবাকে দেখতে এসেছে। হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন :

সারা রাত ঝড়-তুফানে গ্রাম লণ্ডভণ্ড। ফজরের আজানের অপেক্ষা করিতে করিতে ইজিচেয়ারে কাৎ হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন সিদ্দিকুর রহমান। তাহার ঘুম ভাঙিল আজানের কিছু পরে। তিনি চোখ মেলিয়া দেখিলেন অসম্ভব রূপবতী অপরিচিত একটি তরুণী তাহার দিকে তাকাইয়া আছে। তরুণীটির মুখ হাসি হাসি, চোখে বিস্ময়। তাহাকে চোখ মেলিতে দেখিয়া তরুণী তাহার দিকে ঝুঁকিয়া আসিয়া বলিল, ‘বাবা আমি লীলা। লীলাবতী। আপনার কি শরীর খারাপ?’ সিদ্দিকুর রহমান জবাব দিলেন না; মেয়ের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। লীলাবতী অসংকোচে তাহার বাবার বুকের ওপর হাত রাখিল। সিদ্দিকুর রহমানের দুই চোখ দিয়া পানি পড়িতে শুরু করিল।

এই উদাহরণটি উপস্থাপনের পশ্চাতে একটি কারণ রয়েছে। কথাসাহিত্যিকদের একটি প্রবণতা হলো নানা ফিকিরে-ফন্দিতে বয়ান দীর্ঘ করা। হুমায়ূন আহমেদ ব্যতিক্রম। দীর্ঘ রচনা হুমায়ূন আহমেদের ধাতে ছিল না; তার অধিকাংশ গ্রন্থই স্বল্পাবয়ব।

তিনি বর্ণনার পরিবর্তে চলচ্চিত্রের মতো ঘটনাটির চিত্রায়ন করেছেন। লীলাবতী বাবাকে ক্ষমা করেছে, এটা বোঝানোর জন্য তিনি লিখেছেন, ‘তরুণীটির মুখ হাসি হাসি, চোখে বিস্ময়।’ হঠাৎ কন্যাকে দেখে সিদ্দিকুর রহমান আনন্দে আত্মহারা পড়লেন এ কথা না-লিখে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘সিদ্দিকুর রহমানের দুই চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল।’ কী কারণে লীলাবতী তার বাবাকে ক্ষমা করেছে আর কেনই-বা সিদ্দিকুর রহমান আনন্দে আত্মহারা হলেন—এসবের ব্যাখ্যা না-দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ নীরবতা অবলম্বন করেছেন।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাবে বাংলা কথাসাহিত্য বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যে এমনভাবে ভরপুর হয়ে উঠেছে, যা ছিল অপ্রত্যাশিত। তার লেখনী বাংলা কথাসাহিত্যে এমন প্রাণশক্তি সঞ্চার করেছে, যা গল্পের শক্তিতে, ভাষার প্রাঞ্জলতায়, সংলাপের যাথার্থ্যে ও চরিত্রচিত্রণের নিপুণতায় পাঠককে বিস্মিত করেছে। তার কলমে মানুষের জীবন চিত্রায়িত হয়েছে এমন রসসিক্ত বর্ণনায় যা অভূতপূর্ব। তিনি উপন্যাসে ‘গল্প’ যোগ করেছেন, এমন সব গল্প যা মানুষকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, বিস্মিত করেছে, শিক্ষিত করেছে; সেই সব গল্প, যার অবর্তমানে সাহিত্য বিশুষ্ক গাছের মতো নিষ্প্রাণ থেকে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত