প্রচ্ছদ রচনা

হুমায়ূনের ‘গল্প’ ও গদ্য : কে কার অলংকার

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সমালোচনা আজ প্রায় অগণিত আর অন্তহীন। কিন্তু এ কথা মনে না রেখে পারি না যে, এককালে হুমায়ূনের বিদ্যায়তনিক তকমা ছিল ‘অপন্যাসিক’; উপন্যাস নয়, যেন তিনি অঢেল ‘অপন্যাস’ উৎপাদন করেছেন। আর তাই পড়ালেখা ও গবেষণার চত্বরে হুমায়ূনের প্রবেশাধিকার প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। মৃত্যু-পরবর্তী সময় হুমায়ূন ও তার লেখার প্রতি আমাদের মনোযোগ বেড়েছে। তার সাহিত্য আর চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক ও ভাবাদর্শিক ব্যাখ্যা রচনা করেছেন কেউ কেউ। যদিও এখনো আগের মতো করে অনেককেই বলতে শোনা যায়, হুমায়ূন আহমেদ ‘তরল’ লেখা লেখেন। তবে তারল্য চিহ্নিতকরণ এ লেখার লক্ষ্য নয়। আমি শুধু খুঁজতে চেয়েছি, ছোট কিছু প্রশ্নের জবাব, হুমায়ূন আসলে কেমন গদ্য লেখেন? তার সাহিত্যের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভাষার কোনো সম্পর্ক আছে কি? বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ঐতিহ্যে হুমায়ূন কীভাবে হয়ে উঠলেন নিজস্ব শৈলীর স্রষ্টা?

এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের চোখ রাখতে হয় বাংলা গদ্যের ঐতিহাসিক বিকাশের ওপর। দেখতে পাই, বছরের পর বছর ধরে শব্দ আর বাক্যের প্রয়োগ নিয়ে নানা রকম নিরীক্ষা চলেছে। বাংলা শব্দের সম্ভারকে উপচে ফেলা হয়েছে সংস্কৃত শব্দরাশি দিয়ে। সমাসের আঠায় শব্দের সঙ্গে শব্দ জোড়া দিয়ে দিয়ে বানানো হয়েছে অব্যবহৃত ও জটিল সব শব্দ। আবার ইংরেজি কায়দায় অনুবাক্যের মুহুর্মুহু প্রয়োগে বাক্য হয়ে উঠেছে দীর্ঘ। গঠনগত দিক থেকে এ-ই হলো বাংলা গদ্যের প্রভাবশালী কৌশল। বিশেষ অর্থে, সংস্কৃতায়নের এই কৌশল বা চেতনাকে আমরা বলতে পারি বাংলা ভাষার ‘সংস্কৃতবাদ’।

কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবিতার সূত্র ধরে গড়ে ওঠা এই ভাষাচেতনার দ্বিতীয় একটি অবস্থানের নাম হতে পারে, ‘পূর্ববঙ্গবিরোধিতা’। কেননা এ রীতির বাংলা ভাষায় পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণ ও বাচন অনাহূত। হুমায়ূনের অবস্থান এই দুই চেতনার বিপরীতে। তার মানে এই নয় যে, বাংলা ভাষায় কিংবা কথাসাহিত্যের ঐতিহ্যে এ রকম আঘাতের ঘটনা আর ঘটেনি।

প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নক্সা সংস্কৃতবাদী চৈতন্যে বড়সড় ধাক্কা মেরেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সংস্কৃতমুগ্ধ লেখককেও তা আমলে নিতে হয়েছিল। আর রবীন্দ্রনাথ? তার ভাষাকাঠামোজুড়ে সংস্কৃতের প্রচ্ছায়া থাকলেও তিনি মূলত সংস্কৃতের বাহিরমহলের বাসিন্দা। অন্তত গদ্যে রবীন্দ্রনাথ কখনোই নিবিড়ভাবে সংস্কৃতঘেঁষা নন। শরৎচন্দ্র এসে গদ্যের ভাষাকে যথাসাধ্য সরল করেছেন। তবু স্বীকার করতে হবে যে, বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের সাধু রীতি-নির্ভর গদ্য বাঙালির কথ্যভাষার পরিমণ্ডলে খুবই কমই আনাগোনা করতে পেরেছে।

বাংলাদেশ, অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের লেখককুল ঐতিহ্যিকভাবে এই ভাষাবিশ্বকেই হাতের কাছে পেয়েছিলেন। মীর মশাররফ হোসেনও আদতে ওই ভাষাবৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্গত। প্রকৃতপক্ষে পূর্ববঙ্গের লেখকদের ‘সংস্কৃতবাদ’ ও ‘পূর্ববঙ্গবিরোধিতা’—এই দুই ভাষিক বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতার লেখক ও ব্যাকরণবিদদের কাছে পূর্ববঙ্গের ভাষা ছিল ‘কার্কশ্য ও উচ্চারণদোষে দুষ্ট’।

এ কথা আজ প্রমাণিত যে, বাংলা ভাষার মান্যায়নে পূর্ববঙ্গের গুরুত্ব ও অংশগ্রহণ ছিল না। এ কারণে কথাসাহিত্য লিখতে গিয়ে পূর্ববঙ্গবাসী লেখককে ভাষার রীতি ও কলাকৌশল সম্পর্কে বিশেষভাবে ভাবতে হয়েছে। কারণ উপন্যাসের বিষয় ও জনপদ যদি হয় পূর্ববঙ্গের, তাহলে বাস্তবতা নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে বয়ানের ভাষা কখনোই পশ্চিমবঙ্গীয় কাঠামোর হতে পারে না।

আমরা দেখতে পাই, বিশ শতকে প্রথম দুই-তিন দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে গভীর ভাষা-সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কলকাতার বাংলাও ততদিনে প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে। মুখের ভাষা বনাম লেখার ভাষা নিয়ে জমে উঠেছে আলাপ। হুমায়ূন আহমেদকে রাখা যায় বাংলা ভাষার রীতিগত অনুসন্ধানের এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। কেননা নিজের জন্য ভাষারীতি সৃষ্টি করতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদে ‘সংস্কৃতবাদ’ ও ‘পূর্ববঙ্গবিরোধিতা’র মহলে জোরেশোরে আঘাত করেছেন। এর ছোট্ট একটি স্বীকারোক্তি মেলে তার বলপয়েন্ট বইয়ে। হুমায়ূন লিখেছেন, ‘আমি খুব সূক্ষ্মভাবে নাটকের ভাষা বদলানোর একটা চেষ্টা চালালাম। আগে কলকাতার ভাষা (নদীয়া-শান্তিপুরের ভাষা বলাই ঠিক হবে) ছিল বিটিভির নাটকের ভাষা। যাইনি, খাইনি, জুতো, নৌকো। আমি চেষ্টা করলাম ঢাকার ভাষা বলে আলাদা কিছু দাঁড় করাতে। আমার ধারণা পরীক্ষা-নিরীক্ষা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। আজকের নাটকের ভাষা “নদীয়া-শান্তিপুর” মুক্ত।’

হুমায়ূনের পর্যবেক্ষণ শতভাগ সত্য। তিনি যখন নাটক লিখছেন তখন বাংলাদেশের সিনেমা, এমনকি সাহিত্যও ‘নদীয়া-শান্তিপুর মুক্ত’ হতে পারেনি। বাংলাদেশের গণমাধ্যম মুখ্যত কলকাতা-মুখী বাংলা ভাষাকেই আশ্রয় করেছে। ষাট থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যাবে এই ভাষার বিস্তৃত ছায়া।

বলপয়েন্ট বইয়ে করা হুমায়ূনের মন্তব্যটি টিভিনাটককেন্দ্রিক। কিন্তু তার ভাষার দৃষ্টান্ত এই সত্যই জানান দেয় যে, হুমায়ূন শুরু থেকেই অবস্থান করেছেন সংস্কৃত কিংবা কলকাতা আচ্ছাদিত ছায়ার অন্য মেরুতে, যেমনটা দেখা যায় নন্দিত নরকে উপন্যাসে। অহরহই তৈরি করেছেন তিন, চার কিংবা পাঁচ শব্দের বাক্য। শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসে হুমায়ূন লিখলেন, ‘ছোট খালা আসলেন নয়টায়।’ কিংবা ‘সারা রাত অঘুমা থাকায় মাখা ব্যথা করছিল।’ কিংবা, ‘ঝুনু প্রথমে থতমত খেল।’ ‘আসলেন’, ‘অঘুমা’, ‘থতমত’—এই তিনের বিপরীতে হুমায়ূন অনায়াসে লিখতে পারতেন ‘এলেন’, ‘নির্ঘুম’, ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’।

হুমায়ূনের ঝোঁক বলে দেয়—তার অভিমুখ সংস্কৃতের দিকে নয়। তিনি নির্বাচন করেছেন এমন এক রীতি, যার সঙ্গে সহযোগ আছে কথ্যের, পূর্ববঙ্গের বা বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লৌকিকতার। সেই সঙ্গে হুমায়ূন রচনা করেন ছোট সরল বাক্য। বাক্য যদি দীর্ঘ হয়েও ওঠে কথ্যময়তার কারণে সেসব বাক্য আর দীর্ঘ লাগে না; সেসব বাক্য অতিক্রম করে না বোধগম্যতার সীমা।

হুমায়ূনের সামনে এ ধরনের কোনো আদর্শ কি ছিল? খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথাই ভাবা যাক। লালসালু উপন্যাসে ভাষার দৃশ্যময়তা আর বাক্যের বিন্যাস দেখে মনে হতে পারে, ভাষা বুঝি সরল। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ গড়ে তুলেছেন ভাষার নিবিড় এক প্রতীকতা। ঘটনার বর্ণনা শোনার বা পড়ার চেয়ে পাঠককে যা নিয়ে যায় অন্য কোনো চেতনালোকে। শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক পড়েও বলা সম্ভব, তিনি কথ্যের অনুরাগী। তবে তার ভাষা যতটা গ্রামীণ বাস্তবতার ধারক, ততটা শহুরে মধ্যবিত্তের অনুষঙ্গী নয়। আমরা হয়তো সৈয়দ শামসুল হকের ভাষার কাছেও যেতে পারি। কিন্তু সে ভাষা ইংরেজি দীর্ঘ বাক্যের অনুসারী। কথ্যের সঙ্গে তার যোগ একেবারেই ক্ষীণ।

বাংলাদেশের ভাষা-চেতনার আলোকে আবুল মনসুর আহমদ ও হুমায়ূন আহমদের তুলনা চলে। কিন্তু মনসুরের ভাষা-চিন্তার মূলে আছে রাজনীতিকেন্দ্রিক আ-পরিচয়। হুমায়ূনের ভাষাচিন্তা ঠিক ততখানি রাজনীতিপ্রবণ নয়। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ব্যাপারটি এমনও নয় যে, হুমায়ূন কলকাতা-আশ্রিত বাংলা ভাষার মান্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই নস্যাৎ করেছেন। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার জন্য যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই তার আরাধ্য। আর তাই এমন ভাষার খোঁজ তিনি করেন যে ভাষা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিনিধি হয়ে উঠবে। ব্যাপক অর্থে এই অবস্থানও রাজনৈতিক। কিন্তু রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের আবেগ সেখানে সক্রিয় নয়। আবুল মনসুর আহমেদকে প্রধানত এই আবেগেই স্পন্দিত হতে দেখি।

হুমায়ূনের গদ্যের পূর্বসূরি নিদর্শন যদি খুঁজতেই হয়, তাহলে তার দেখা মিলতে পারে জহির রায়হানের গল্প-উপন্যাসে। তিনিও গল্প বলেছেন ছোট ছোট বাক্যে। সংস্কৃতবাদের কোনো ছাপ নেই। একটি, দুটি বা তিনটি শব্দ দিয়ে জহির এঁকে ফেলেন ছবি। যেন তিনি নির্মাণ করছেন কোনো চলচ্চিত্রিক দৃশ্য। প্রতিবেশ আর ঘটনাগুলো তাই বিভক্ত হয়েছে একেকটি শটে। হুমায়ূনের মধ্যেও আছে দৃশ্য তৈরির প্রবণতা। তবে হুমায়ূন প্রতিবেশ বর্ণনার মাধ্যমে ঘটনাকে মূর্ত করে তোলেন না, ঘটনার ঘটমানতাই হাজির হয় প্রধান শক্তি আকারে।

আর তারই সূত্রে হুমায়ূনের সাহিত্যের জন্য নতুন এক ধরনের গদ্যের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যেখানে লেখকের বর্ণনার ভেতর দিয়েই শোনা যাবে মানুষের কণ্ঠস্বর; মুদ্রিত অক্ষর থেকেই যেন উত্থিত হবে মানবিক ধ্বনি আর কণ্ঠের বিভঙ্গ। এদিক থেকে জহির রায়হানের ভাষা কাব্যিক, কথ্য থেকে বিচ্যুত। ইন্দ্রিয়ের মধ্যে দৃষ্টিকেই সে ভাষা বিশেষভাবে উদ্দীপিত করে। কিন্তু হুমায়ূনের গদ্যে বেজে ওঠে কথকের কণ্ঠ আর অবারিত সংলাপ। শ্রেণি ও অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে সংলাপগুলো চিনিয়ে দেয় সমাজ ও সংস্কৃতির বহুস্তরিত বিন্যাস। প্রকৃতপক্ষে স্থান-কাল-পাত্র অথবা সামগ্রিক প্রতিবেশ উঠে আসে কথকের কণ্ঠস্বরের সমগ্রতায়। পাঠক যেন বসে আছেন এক অদম্য কথকের সামনে।

সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য এই যে, হুমায়ূন গদ্যে এনেছেন বৈঠকি মেজাজ আর কৌতুকী আবহ। এ ভাষা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কিংবা শ্রীরামপুর মিশন থেকে দূরে। উপনিবেশিত বাংলা ভাষার চিহ্ন এখানে সবল নয়। ওই ভাষায় থাকে হাস্যরস, ধাঁধা আর প্রবচনের মতো উক্তি। শঙ্খনীল কারাগারে যেমন করেছেন, ‘মৃত্যুর জন্য মানুষ শোক করে ঠিকই কিন্তু সে শোক স্মৃতির শোক, এর বেশি কিছু নয়।’ চিরায়ত সত্যের মতো করে লেখেন, ‘ঠিক ভোর হবার মুহূর্তে মনের গ্লানি কেটে যায়। সুন্দর সুখের স্মৃতিগুলো ফিরে আসে।’ সত্যিই কি সব মানুষের জন্য ভোরবেলা এমন? নিঃসন্দেহে তা নয়; কিন্তু হুমায়ূন এই মুহূর্তগুলো সৃষ্টি করেন, কোনো কোনো ঘটনা, স্মৃতি আর মুহূর্তকে স্মরণযোগ্য করে তোলেন। 

সব মিলিয়ে এ এক নিজস্ব শৈলী; হুমায়ূন এমন এক বাস্তবতাকে নির্মাণ করেন যে বাস্তবতা মধ্যবিত্ত গার্হস্থ্য জীবনের অন্তরঙ্গ গল্প বলে। বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাসে এই জীবন খুব বেশি উন্মোচিত হয়নি। হুমায়ূন-পূর্ব কথাসাহিত্য প্রধানত হয়ে উঠেছে পূর্ববঙ্গের রাজনীতি ও পরিচয়-সংকটের আখ্যান। সেখানে মানুষের প্রাত্যহিকতাও কমবেশি রাজনীতির অংশ। সত্যিকার অর্থে, চেনা দৈনন্দিনের প্রতিচ্ছবি—পারিবারিক খুনসুটি, হই-হুল্লোড়, আনন্দ-বিষাদের ফিকশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বাংলা কথাসাহিত্যে দুর্লভ।

হুমায়ূনীয় গদ্যের সংকটও আছে। ইতিহাসের যেকোনো পর্বের আখ্যানকে হুমায়ূন ধারণ করতে চেয়েছেন একই ভাষাকাঠামোর আওতায়। হোক তা মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প কিংবা হিমু-মিসির আলী বিষয়ক কোনো উপন্যাস। মনে হয়, এই সেদিনের ভাষা। সময়ের ধারণাও যে ভাষার প্রতিবেশ নির্মাণ করতে পারে, সেদিকে হুমায়ূনের দৃষ্টি কম। বাদশাহ নামদার এক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রমী। প্রচুর তৎসম শব্দ ও স্বল্প-পরিচিত আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগের কারণে এ বইয়ের গদ্যকে খানিকটা আলাদা খোপে রাখতে হবে। ব্যতিক্রমটুকু বাদ দিয়ে বলতেই হয় হুমায়ূনের গদ্য মুখ্যত একই শৈলীতে আবর্তিত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে এই গদ্য নির্বাচন না করে হুমায়ূনের উপায় ছিল না। কেননা তিনি তো গল্পই বলতে চান। সাধারণভাবে গল্প হলো কথা বলার উপায়। এই ক্রিয়া দিয়ে আমরা বলি, গল্প করা, গল্প বলা, গালগল্প, গপ্পো দেওয়া ইত্যাদি। হুমায়ূনের কাছে গল্প ধারণ করে আরও গভীরতর অর্থ। ‘গল্প’ তার একটি কৌশল। যেকোনো বিষয়, মুহূর্ত আর ঘটনাকে গল্পে রূপান্তরিত করতে চান, কোনো কিছু বর্ণনা করতে চান।

ছোটগল্পে তো গল্প থাকেই। উপন্যাস এক অর্থে গল্পেরই বিস্তার। কিন্তু হুমায়ূন যখন সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য নিবন্ধ লেখেন, তখনো সেখানে ঢুকে পড়ে গল্প। যেন অভ্যাসবশত দৈনিক বাংলার জন্য লেখা গদ্যগুলো পেয়ে যায় গল্পের আভা। দেখা যায়, সকল কাঁটা ধন্য করে বইয়ের সবগুলো লেখার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে গল্প-কাঠামো। পঞ্চাশের দশকের এক কবি; একজন বিদ্যায়তনিক পণ্ডিতও বটে, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ‘নিজের নির্জনে’ নামের এক জার্নালে লিখেছেন, ‘হুমায়ূনের লেখা আমাকে চুম্বকের মতো টানে। তার গল্প বলার ক্ষমতা, রসবোধ, অসম্ভব সাবলীল সংলাপ, আমাকে নিমিষে ব্যক্তিগত পরিপার্শ্বের বাইরে নিয়ে যায়। নাকি সেই পরিপার্শ্বকেই আরও গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করে?’

একদিকে ‘অপন্যাসে’র অভিধা, অন্যদিকে ‘চুম্বকের মতো টান’, বিদ্যায়তনের চত্বর থেকে আসা এই দোটানার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করে—হুমায়ূনের কাছে গল্প শুধু কথনের মাধ্যম নয়, লিখনেরও প্রধান উপায়; গল্প দিয়ে সবকিছুই বলা যায়। লিখনের ভেতর দিয়ে তিনি তাই চালিত করতে চান কথনের স্বভাব। হয়তো তাই হুমায়ূনের গদ্য কথ্যাশ্রয়ী না হয়ে পারে না। তার লেখায় গল্প ও গদ্যের এই অনিবার্য সন্ধি সুন্দর, কিন্তু ‘কে কার অলংকার’!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত