জলবায়ু পরিবর্তনের হটস্পট মাতারবাড়ীর সাইরার ডেইল

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৬ এএম

সাগরের উত্তাল ঢেউগুলো তীরে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নোনাজলে বিলীন হচ্ছে মাটির একটা বড় অংশ। হারিয়ে যাচ্ছে কোনো না কোনো পরিবারের শেষ আশ্রয়। এটি কোনো কাল্পনিক দৃশ্য নয়, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাইরার ডেইল এলাকার জালিয়াপাড়া ও বাহিরপাড়ার প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ও বিরূপ প্রভাব কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তারই জীবন্ত ও করুণ উদাহরণ মহেশখালীর এই উপকূলীয় জনপদ।

একসময় বঙ্গোপসাগরের রূপালী মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছিল এক শান্ত, সমৃদ্ধ, মুখরিত ও জনবহুল গ্রাম। আজ তা রূপ নিয়েছে জলবায়ু ট্র্যাজেডির এক নির্মম প্রান্তরে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার, ঘন ঘন ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড় এবং অব্যাহত উপকূল ভাঙনের করাল গ্রাসে প্রতিদিনই মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে স্থানীয়দের বাপ-দাদার ভিটে। গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অন্যের জমিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে হাজারো মানুষ।

স্থানীয়দের ভাষায়, সমুদ্র তো শুধু আমাদের জমি গিলে খাচ্ছে না, সমুদ্র গিলে খাচ্ছে আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, ইতিহাস আর আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

সম্প্রতি সরেজমিন মাতারবাড়ীর সাইরার ডেইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক আর চরম অনিশ্চয়তা। যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগেও সারিবদ্ধ ঘরবাড়ি, শিশুদের খেলার মাঠ, ফসলি জমি আর মাছ শুকানোর খলা (উন্মুক্ত স্থান) ছিল, সেখানে এখন শুধুই ঢেউয়ের গর্জন আর ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। সমুদ্রের প্রতিটি জোয়ার যেন আরও কয়েক হাত জমি জোর করে কেড়ে নিচ্ছে স্থলের বুক থেকে।

উপকূলের এই ভাঙন এতটাই তীব্র যে, অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে গত ৩-৪ বছরের মধ্যে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত নিজেদের ঘর ভেঙে পেছনে সরিয়েছে। কিন্তু এখন আর সরানোর মতো কোনো নিরাপদ জায়গা অবশিষ্ট নেই। এককথায়, মাতারবাড়ি জালিয়াপাড়া ও বাহিরপাড়ার বাসিন্দারা এখন আক্ষরিক অর্থেই সাগরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। যেকোনো মুহূর্তে তাদের ঘরটি সাগরে বিলীন হয়ে যাবে।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও মৎস্যজীবীরা জানান, আগে এই অঞ্চলে ভাঙন ছিল মূলত ‘মৌসুমি’। অর্থাৎ বর্ষাকালে বা বড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সময় সমুদ্র উত্তাল হয়ে তীর ভাঙত। শীতকালে বা শুকনো মৌসুমে সমুদ্র শান্ত থাকত এবং অনেক সময় চরের সৃষ্টি হতো। কিন্তু জলবায়ুর আচরণ বদলে যাওয়ায় এখন প্রায় সারা বছরই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে প্রতি মাসের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে এলাকায় সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বাড়ে। স্বাভাবিকের চেয়ে এ সময় ৪-৫ ফুট উঁচুতে আসা পানি সরাসরি আঘাত করে কাঁচা ও আধা-পাকা ঘরবাড়িতে। সমুদ্রের নোনাপানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরে। নোনাপানির তীব্রতায় নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সুপেয় পানির একমাত্র উৎস নলকূপগুলো।

সাইরার ডেইলের বাহিরপাড়ার বাসিন্দা আব্দু জব্বার সাগরের দিকে হাত উঁচিয়ে  বলেন, ওই যে দূরে যেখানে এখন বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে, ওখানে আমার পৈতৃক ভিটা ছিল। আমার দাদার আমলের আমগাছ ছিল সেখানে। সাগর সব গিলে খেয়েছে।

একই পাড়ার গৃহবধূ রহিমা বেগম জানান, রাতে যখন জোয়ারে সাগরের ঢেউ ঘরের দেওয়ালে আঘাত করে, তখন মনে হয় এই বুঝি ঘরটা সাগরে ভেসে গেল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মেগা প্রকল্পের জন্য সমুদ্রের তলদেশ খনন (ড্রেজিং), জেটি নির্মাণ এবং বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ভরাটের কারণে উপকূলীয় এলাকার স্বাভাবিক ভৌগোলিক গঠন এবং সামুদ্রিক জলপ্রবাহের গতিপথে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্পের কারণে একদিকের পানির চাপ অন্যদিকে স্থানান্তরিত হওয়ায় সাইরার ডেইল ও জালিয়াপাড়া এলাকাটি তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে।

সাইরার ডেইল এলাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, সাইরার ডেইল ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্র এখন ভয়াবহ। প্রতিদিন কেউ না কেউ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। এটি এখন আর সামলানো যাচ্ছে না।

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আবু হায়দার  বলেন, সাইরার ডেইলের ভাঙন পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করেছি। কিন্তু দৃশ্যমান এবং কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দীন আহমদ বলেন, বিভিন্ন স্থানে বাঁধ তৈরির কাজ করার পাশপাশি নতুন করে যেখানে ভাঙন তৈরি হচ্ছে সেসব জায়গাও আমরা পর্যাবেক্ষণে রেখেছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত