জরুরি চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ চাইল অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

দেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও ফলপ্রসূ রাখতে অ্যাম্বুলেন্স খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের আকুল আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি। শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানী ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই জোরালো দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেন যে, অ্যাম্বুলেন্স মোটেও সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবস্থা নয়; বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত একটি অতি জরুরি ও জনকল্যাণমূলক বিশেষায়িত বাণিজ্যিক সেবা। তারা উল্লেখ করেন, প্রতিদিন অগণিত সংকটাপন্ন রোগী, সড়কসহ নানা দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত ব্যক্তি এবং প্রসূতি মায়েদের দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্স খাত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে নিবন্ধন জটিলতা, বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা, প্রশাসনিক চাপ ও হয়রানি, কথায় কথায় মামলা ও জরিমানা, অবকাঠামোগত তীব্র সীমাবদ্ধতা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নীতিমালার অনুপস্থিতির কারণে এই খাতটি এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি।

সম্মেলনে বক্তারা আরও সতর্ক করেন যে, একটি অ্যাম্বুলেন্সের প্রতিটি মুহূর্ত একজন মানুষের জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই জীবনরক্ষাকারী এই সেবা খাতটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি, প্রশাসনিক ও নীতিগত সুসংহত সুরক্ষা প্রদান করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ অবস্থায় সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট দাবিসমূহ পেশ করা হয়:

১. সাধারণ বাণিজ্যিক পরিবহন হিসেবে নয়, অ্যাম্বুলেন্সকেজরুরি জনকল্যাণমূলক বিশেষায়িত বাণিজ্যিক পরিবহন হিসেবে আইনি স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে এবং সেই আলোকেই যথাযথ আইনি কাঠামো ও বিধিমালা তৈরি করতে হবে।

২. অ্যাম্বুলেন্স খাতের জন্য বিদ্যমান ৫২ (বাহান্ন) টাকার অগ্রিম আয়কর (AIT) দেশের সকল অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই সমানভাবে ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে।

৩. অ্যাম্বুলেন্সের সঠিক নিবন্ধন, কর নির্ধারণ, ফিটনেস যাচাই, চলাচল এবং সেবার সার্বিক মানদণ্ড ঠিক করতে একটি সমন্বিত জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালা দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

৪. প্রস্তাবিত জাতীয় নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ওপর চলমান সকল মামলা, জরিমানা ও হয়রানিমূলক প্রশাসনিক তৎপরতা অবিলম্বে স্থগিত রাখতে হবে।

৫. পরিচালনার পথে প্রধান বাধা অযৌক্তিক কর কাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা ও বৈষম্যমূলক নিয়মাবলী পুনর্বিবেচনা করে একটি গণমুখী ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

৬. প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সর্বত্র সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌছে দিতে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা খাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সমর্থন, প্রণোদনা ও বিশেষ সুবিধাদি দিতে হবে।

৭. মৃতদেহ বহনকারী লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে দেশের সকল ফ্লাইওভার, সেতু ও টানেলের টোল প্রদান থেকে সম্পূর্ণভাবে মওকুফ ঘোষণা করতে হবে।

৮. জরুরি সেবার গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে সারা দেশে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নির্বিঘ্ন ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৯. দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থাকেন্দ্রে সেবা স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে অ্যাম্বুলেন্সের পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত, পৃথক ও স্থায়ী স্থান সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

সম্মেলনে বক্তারা দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, একজন মুমূর্ষু রোগীর কাছে অ্যাম্বুলেন্সের মালিকানা সরকারি নাকি বেসরকারি তা মোটেও মুখ্য বিষয় নয়; মুখ্য বিষয় হলো জীবন বাঁচাতে সময়মতো সেবা পাওয়া। তাই সরকারি, বেসরকারি, হাসপাতালকেন্দ্রিক ও সেবাধর্মী—সকল প্রকার অ্যাম্বুলেন্সের পরিচালনা সহজতর করতে একটি সমান, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা জরুরি। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকারের জনকল্যাণমুখী মানসিকতার আলোকেই এসব সমস্যার আশু সমাধান আসবে এবং দেশের জরুরি চিকিৎসাসেবা আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক হবে।

সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ বাদল হোসেন মাতবর সরকারকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের পেশকৃত দাবিসমূহ পূরণে যদি দৃশ্যমান ও কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী বুধবার সকাল ৬টা থেকে সারা দেশজুড়ে সকল প্রকার অ্যাম্বুলেন্স চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখা হবে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করবেন বলে পরিষ্কার ঘোষণা দেন।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোঃ দবির হোসেনসহ কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অ্যাম্বুলেন্স মালিক, চালক ও এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিপুল সংখ্যায় উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত