কোর্স পুরনো, নেই শিক্ষার্থী

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

শিক্ষার্থী শূন্যতায় ভুগছে যশোর অঞ্চলের কারিগরি শিক্ষার বড় একটি অংশ। স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণগুলো ক্যারিয়ার গড়তে বা উচ্চশিক্ষায় তেমন কাজে আসছে না। কোর্স পুরনো হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এসব কোর্সের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে যশোরে বছরের পর বছর জাতীয় দক্ষতামান বেসিক (৩৬০ ঘণ্টা মেয়াদি) শিক্ষাক্রমে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। কোথাও ছয় বছর, কোথাও সাত বছর, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তিন বছরের বেশি সময় ধরে কার্যত শিক্ষা কার্যক্রমই বন্ধ। অথচ এতদিন এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান অনুমোদন বহাল ছিল। অবশেষে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা আমলে নিয়ে যশোরের ২৯টি প্রতিষ্ঠানে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সেশনের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতের চূড়ান্ত নোটিস দিয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে পাঠদান অনুমোদন বাতিল বা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর আগে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ১ জুলাই জারি করা চূড়ান্ত নোটিসে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যশোরের কোনো প্রতিষ্ঠানই বোর্ডে জবাব জমা দেয়নি। এরপরই ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বোর্ডের আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বক্তব্য নেই বলে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পাঠদান অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কোর্সের নিবন্ধন বাতিল বা প্রত্যাহারসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শহরের আরবপুর-পালবাড়ি এলাকার যশোর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কলেজে গত সাত বছর জাতীয় দক্ষতামান বেসিক শিক্ষাক্রমে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, ইলেকট্রিশিয়ান, সার্ভেয়ারসহ কয়েকটি ছয় মাস মেয়াদি কোর্স পরিচালনার অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে এসব কোর্সে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে পাওয়া সনদের বাস্তব কর্মসংস্থান বা উচ্চশিক্ষায় তেমন মূল্য না থাকায় শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারিয়েছে। বোর্ড সময়োপযোগী কোর্স চালু করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।

একই চিত্র শহরতলির ভেকুটিয়ার আহছানিয়া মিশন ট্রেনিং সেন্টারে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. জুয়েল জানান, সর্বশেষ তিন বছর আগে ইলেকট্রিক্যাল হাউজিং ওয়্যারিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, কম্পিউটার, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও অটোমোবাইলস বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো শিক্ষার্থী না আসায় কোর্সগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি শিক্ষকের চাকরিও টেকেনি।

ঝিকরগাছার পলি কম্পিউটার অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটেও একই অবস্থা। দীর্ঘদিন কোনো শিক্ষার্থী না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বহাল ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক বলেন, বর্তমান ৩৬০ ঘণ্টার জাতীয় দক্ষতামান বেসিক কোর্সটি শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শিক্ষার্থীরা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কোর্সটি আধুনিক ও কর্মমুখী করার জন্য বোর্ডের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় দেখলে চলবে না। শিক্ষার্থীরা কেন এসব কোর্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন জরুরি। কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগহীন ও পুরনো সিলেবাসের কোর্স চালু রেখে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। ফলে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যও ব্যাহত হচ্ছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী, ভর্তি স্থগিতে চূড়ান্ত নোটিস দেওয়া ২৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যশোর সদরের টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যশোর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কলেজ, সিটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ট্রাস্ট কম্পিউটার সিস্টেম, দর্পণ যুব কম্পিউটার অ্যাকাডেমি, সেন্টার ফর কম্পিউটার এডুকেশন যশোর, মডেল পলিটেকনিক কলেজ, বাংলাদেশ টেকনিক্যাল কলেজ, কপোতাক্ষ পলিটেকনিক কলেজ ভেকুটিয়া, সিটি পলিটেকনিক কলেজ, ইছালী ইউনিয়ন ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার, আহছানিয়া মিশন ট্রেনিং সেন্টার, আইম কম্পিউটার টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, জেসিএফ টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, জেন আইটি যশোর, ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ডিস্ট্রিক্ট আনসার অ্যান্ড পিডিপি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, ইন্টিলেন্ট আইটি, যোজান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপম্যান্ট ইনস্টিটিউট।

মণিরামপুরে চূড়ান্ত নোটিস পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে চারুনীড় রিলেশন অব আর্ট, জোহরা নাজির ফাউন্ডেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, সিবাস কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। কেশবপুরের কসমিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ন্যাশনাল কম্পিউটার প্রশিক্ষণ একাডেমি ও শহীদ স্মৃতি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। আর ঝিকরগাছার জিস্ট কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, পলি কম্পিউটার অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ও কপোতাক্ষ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং শার্শায় নোটিস দেওয়া হয়েছে জনকল্যাণ কারিগরি ইনস্টিটিউটকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত