কুমিল্লায় বাড়ছে অপরাধ ৬ মাসে ৭৩ খুন

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীদের সহজে পার পেয়ে যাওয়া, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির শিথিলতায় কুমিল্লায় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে অপরাধ। জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকের বিস্তার সাধারণ মানুষের সামাজিক স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ৬ মাসে কুমিল্লায় ৭৩টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ২৮টি ডাকাতি ও ২৪৪টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সমাজে প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ করে নতুন অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

রাতের আঁধারে কোলাহল কমলেই শহরের নির্জন সড়কগুলোয় বাড়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীর উৎপাত। কখনো যাত্রী, আবার কখনো চালকের ছদ্মবেশে তারা অপরাধ সংঘটন করছে। সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের নৃশংস হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অপরাধের মূল ধরন এক থাকলেও স্থান ও কালভেদে কৌশল পাল্টাচ্ছে অপরাধীরা। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, পুলিশের গাড়িতে হামলা, বসতবাড়ি থেকে কিশোরীকে অপহরণ কিংবা চোরাকারবারিদের ছবি তুলতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

অপরাধীরা ধরা পড়ার পরও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে আবারও পুরনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধার ও কিশোর গ্যাং দমনে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। আমরা অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান দিচ্ছি, কিন্তু তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসছে। বিষয়টি পুলিশের কাজের জন্য চরম চ্যালেঞ্জিং ও কষ্টের।’

এদিকে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিকেও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন বলেন, মামলা দায়ের থেকে রায় পর্যন্ত অনেক ধাপ পার হতে হয়। সাক্ষী না পাওয়া বা দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর বাদী-বিবাদীর মধ্যে আপস হয়ে যাওয়ার মতো নানা জটিলতায় দ্রুত বিচার শেষ করা সম্ভব হয় না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও নজরদারিতে শিথিলতার কারণেই অপরাধীরা পার পাওয়ার সাহস পাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগের প্রধান ড. মো. নায়ীম আলীমুল হায়দার। তিনি বলেন, অপরাধীরা মনে করছে যে তারা অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্ভিলেন্স শিথিল থাকার কারণেই এই সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এখনই সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত বলতে নারাজ কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু। তিনি বলেন, পরিস্থিতি শুনতে যতটা আশঙ্কাজনক মনে হয়, গ্রাফ কিন্তু তা বলে না। তবে কিশোর গ্যাং এবং মাদকের বিস্তার আমাদের জন্য সত্যিই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কুমিল্লায় অপরাধের অনুকূল পরিবেশ বিনাশ করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টহল ও সিসিটিভি সার্ভিলেন্স আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই কেবল মানুষের উদ্বেগ দূর করা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত