দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ক্রয়ে চরম অনিয়ম, পরিকল্পনাহীনতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্ত নিজেদের মতো সাজানোর মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। আজ বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক কর্মশালায় এ কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন উপলক্ষে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারি কেনাকাটার বেশ কিছু অনিয়মের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানান, ক্রয়ে স্বচ্ছতা না থাকা এবং অডিট সংক্রান্ত নানা জটিলতার কারণে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে। অডিট আপত্তি এড়াতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, সততার সঙ্গে কাজ করলে কাউকে টাকা দিতে হবে না। কেউ ঘুষ দাবি করলে তা সরাসরি তাঁকে জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে ১১ কোটি টাকার দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকায় কিনে বাংকারের অভাবে ফেলে রাখার উদাহরণ দিয়ে তিনি পরিকল্পনাহীন কেনাকাটার কঠোর সমালোচনা করেন।
পিপিআরসির এই গবেষণায় উঠে এসেছে সরকারি স্বাস্থ্যখাতের আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য। দেশের ৮টি বিভাগের ২২টি হাসপাতালে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাসেবার অন্যতম মৌলিক উপাদান ওষুধের সংকট হাসপাতালগুলোতে অত্যন্ত প্রকট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ২২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে। আরও ভয়াবহ অবস্থা মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে, যেখানে ওষুধের প্রাপ্যতা মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
ওষুধের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডায়াগনস্টিক বা পরীক্ষাগার সেবার অবস্থাও বেশ নাজুক। রিএজেন্টের তীব্র ঘাটতি, অকেজো যন্ত্রপাতি এবং টেকনোলজিস্টের অভাবকে এজন্য দায়ী করা হয়েছে। তথ্যে দেখা যায়, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের মোট পদের প্রায় ৪০ শতাংশই বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে রোগীরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য খাতের গুণগত মান নিশ্চিত করতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না, বরং বরাদ্দের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে। সময়মতো অর্থছাড়, সচল যন্ত্রপাতি এবং রোগীদের জন্য ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঠিক লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এই খাতের প্রকৃত উন্নয়নের মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
