প্রায় ৪৫ বছর পর প্রকাশ্যে এসেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশনের প্রতিবেদনের বিস্তারিত অংশ। দীর্ঘদিন প্রতিবেদনটি হারিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হলেও কমিশনের সভাপতির স্বাক্ষর করা মূল প্রতিবেদনের অংশ প্রকাশ করেছে দ্য ডেইলি স্টার।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ঘটনার এক সপ্তাহ পর ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশন ২৫ জুন কাজ শুরু করে এবং ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে সেটি এতদিন প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ডটি ষড়যন্ত্রের ফল কি না, কারা জড়িত এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল-তা অনুসন্ধান করা। কিন্তু পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে এ অংশ বাদ দেয়। ফলে কমিশনের অনুসন্ধান সীমিত হয়ে যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দায়িত্বে অবহেলা এবং ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা মূল্যায়নে।
কমিশনের প্রধান পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার কারণেই হত্যাকাণ্ডটি সম্ভব হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য এবং আধুনিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীদের কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা হয়নি। কৌশলগত স্থানে দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা সক্রিয় থাকলে হামলাকারীদের দোতলায় ওঠা ঠেকানো সম্ভব ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিএফআই ও এনএসআই মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের বিদ্রোহী মনোভাব সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে সতর্ক করেছিল। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাম কোনো তথ্য তারা সংগ্রহ করতে পারেনি।
রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল এওয়াইএম মাহফুজুর রহমান এবং এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকা নিয়েও কমিশন গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। মাহফুজুর রহমান কীভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেলেন, তার কক্ষের গুলির চিহ্ন কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল কি না এবং রাষ্ট্রপতির কক্ষের বাইরে প্রহরা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সঙ্গে সংযোগকারী দরজা ব্যবহার করে উদ্ধারচেষ্টা না করায় ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকা নিয়েও কমিশন বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ দীর্ঘ সময় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে বিদ্রোহী সেনারা সেটি রাঙ্গুনিয়ার একটি গণকবরে দাফন করে। কমিশনের মতে, সে সময় কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং স্থানীয় প্রশাসন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অবস্থায় ছিল না। তাই স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো দায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের শরীরে ২০টি গুলির ক্ষত ছিল। মুখ, ঘাড়, বুক, পেট, হাত ও পায়ে কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ মে ভোর পৌনে ৪টার দিকে হামলাকারীরা দুটি রকেট ও কয়েকটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। পরে রাষ্ট্রপতি কক্ষ থেকে বের হয়ে ‘তোমরা কী চাও?’ বলার পর খুব কাছ থেকে স্টেনগান দিয়ে তাকে গুলি করা হয়।
কমিশনের মতে, মেজর জেনারেল মঞ্জুরই বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, বদলির আদেশ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা তাকে এ সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করে। তবে তার মৃত্যুর তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধির বাইরে থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর চট্টগ্রাম থেকে ‘আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল’ নামে বিদ্রোহী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে পরিকল্পনার দুর্বলতায় বিদ্রোহ দুই দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। ১ জুন মেজর জেনারেল মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেন। পরে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিহত হন।
উপসংহারে কমিশন বলেছে, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত ব্যর্থতার ফলেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। ফলে ১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত এ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘নিরাপত্তা বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
