পুরো নাম আহমেদ সাদ সাবিত। ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞানের প্রতি ছিল তার দুর্নিবার আকর্ষণ। বিজ্ঞানবিষয়ক বই হাতে পেলেই গভীর রাত পর্যন্ত পড়ে শেষ না করা পর্যন্ত তার যেন স্বস্তি মিলত না। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পেয়েছেন বৃত্তি। স্কুল ও কলেজজীবনে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ডিভাইসের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না; বরং জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পদার্থবিজ্ঞান (ফিজিক্স) নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং গবেষণার মাধ্যমে মানবকল্যাণে অবদান রাখা।
শান্ত স্বভাবের সাবিত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও সুযোগ পেলেই বিজ্ঞানবিষয়ক বই পড়তেন। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পরিচালিত বিএএফ শাহীন কলেজের ইংরেজি মাধ্যম থেকে ২০২০ সালে এসএসসি এবং ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে ২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ২০২৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বিভাগে থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার লেখাপড়ার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করছে।
সাবিতের বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা হালিমা সাদিয়া জানান, ছোটবেলা থেকে তাঁর স্বপ্ন ছিল চাকরি নয়, গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বের জন্য নতুন কিছু আবিষ্কার করা। সেই লক্ষ্য পূরণে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণাকাজে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সাবিতের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান বিষয়ে তার গভীর আগ্রহ ছিল। স্কুলজীবনে একবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্য সাবিতকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এরপর থেকে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি তার আগ্রহ আরও দৃঢ় হয়।’
শিক্ষাজীবনে বিভিন্ন বিজ্ঞান মেলা, রচনা প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞানবিষয়ক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি একাধিক আঞ্চলিক ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অলিম্পিয়াডে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হন। একই বছরের অক্টোবরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রোমানিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ওই প্রতিযোগিতায় তার কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাশিয়ার মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার প্রস্তাবও পান।
২০২০ সালে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য তিনি নির্বাচিত হলেও করোনা মহামারির কারণে প্রতিযোগিতাটি স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২০২৩ সালে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ফিজিক্স অলিম্পিয়াডে নটরডেম কলেজের প্রতিনিধিত্ব করে সম্মানসূচক পদক অর্জন করেন। একই বছর জাপানের টোকিওতে আন্তর্জাতিক ফিজিক্স অলিম্পিয়াডেও অংশ নিয়ে সম্মানসূচক পদক লাভ করেন।
সাবিতের মা হালিমা সাদিয়া বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি সে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিল। স্কুলজীবনে বিএনসিসির সদস্য ছিল এবং একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে শিশু সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছে। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় নটরডেম কলেজ বিজ্ঞান ক্লাবের সচিব নির্বাচিত হয়। সে সময় জাতীয় ফিজিক্স অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হয়েছে। সে সব সময় বলত, লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকলে স্বপ্ন একদিন অবশ্যই পূরণ হবে।’
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অসাধারণ একাডেমিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে তাকে তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের নিয়মিত পাঠক্রম অতিক্রম করে সরাসরি মাস্টার্স পর্যায়ের কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। আগামী বছর মে মাসে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি সরাসরি পিএইচডি প্রোগ্রামে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে গবেষণাকাজ পরিচালনা করছেন। ইতোমধ্যে তার একাধিক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
সাবিতের কলেজজীবনের বন্ধু হাসান আল ফারদীন জিম বলেন, ‘সাবিত অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বিনয়ী। ফিজিক্স নিয়ে যে কেউ সহযোগিতা চাইলে আন্তরিকভাবে সাহায্য করে। তার গবেষণা সফল হলে বিশ্ব নতুন কিছু দেখতে পাবে বলে আমার বিশ্বাস।’
বিএএফ শাহীন কলেজ, চট্টগ্রামের উপাধ্যক্ষ তসলিমা বেগম বলেন, ‘আমি নিজে সাবিতকে পড়িয়েছি। ছোটবেলা থেকেই তার জানার আগ্রহ ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে তার কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজ্ঞানের বিভিন্ন উপস্থাপনায় সে সব সময় প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার গবেষণা একদিন বাংলাদেশের জন্য বড় সুনাম বয়ে আনবে বলে আমি আশাবাদী।’
