রূপান্তর : নিজাম বিশ্বাস
অনেক দিন আগের কথা।
এক রাজ্যে এক কৃষক ও তার তিন ছেলে বাস করত।
তাদের মধ্যে বড় দুই ভাই ছিল খুব অহঙ্কারী, কিন্তু ছোট ভাই পপোলভার ছিল একেবারেই শান্ত ও বিনয়ী।
কিন্ত পপোলভারের অদ্ভূত এক অভ্যাস ছিল সে সারাদিন রান্নাঘরের পাশে চুলোর ছাইয়ের মধ্যে বসে থাকত।
এ কারণে তার নাম হয়েছিল ‘পপোলভার’, যার অর্থ ‘ছাইয়ের ছেলে’।
বড় ভাইয়েরা সারাক্ষণ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত।
সবাই তাকে অপদার্থ মনে করত।
এমনই এক সময় রাজ্যে নেমে এলো ভয়াবহ বিপর্যয়।
পাতালপুরী থেকে এক মায়াবী দানব এসে রাজার তিন সুন্দরী কন্যাকে অপহরণ করে নিয়ে গেল।
শোকার্ত রাজা ঘোষণা করলেন, যে বীর রাজকন্যাদের উদ্ধার করে আনতে পারবে, তাকে পুরস্কার হিসেবে অর্ধেক রাজত্ব দেওয়া হবে। শুধুই কি রাজত্ব, সঙ্গে এক রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়েও দেওয়া হবে।
এই ঘোষণা শুনে বড় দুই ভাই নিজেদের বীরত্ব প্রমাণ করার জন্য বিশাল আয়োজন করে অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু তাদের মনে ছিল অহঙ্কার এবং অন্তরে ছিল ভীরুতা, তাই তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলো।
এবার পপোলভারের পালা।
বড় দুই ভাইয়ের মতো সে কোনো দামি ঘোড়া বা ঝকঝকে তলোয়ার নিল না।
বরং আস্তাবলের এক কোণে পড়ে থাকা এক জরাজীর্ণ, রুগ্ন ঘোড়া এবং এক মরিচা ধরা পুরনো তলোয়ার বেছে নিল।
সবাই তাকে দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কিন্তু কেউ জানত না, পপোলভারের মমতা আর নিবিড় সেবায় সেই তুচ্ছ ঘোড়াটিই এক মহাক্ষমতাধর জাদুকরী ঘোড়ায় রূপান্তরিত হয়।
সেই ঘোড়া মানুষের মতো কথা বলতে পারত।
আর বাতাসের বেগে পাহাড়-পর্বত পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।
পপোলভার তার জাদুকরী ঘোড়ায় চড়ে দুর্গম পথে যাত্রা শুরু করল।
পথে তাকে লোহা, রুপা এবং সোনার তিনটি বিশাল পাহাড় অতিক্রম করতে হলো।
প্রতিটি পাহাড়ে তাকে একেকটি ভয়ংকর দানবের মুখোমুখি হতে হয়।
প্রথম দানবের ছিল তিনটি মাথা, দ্বিতীয়টির ছয়টি এবং শেষ দানবের ছিল নয়টি মাথা।
পপোলভার তার অসীম সাহস আর জাদুকরী তলোয়ারের আঘাতে একে একে সব দানবকে পরাজিত করে।
দানবদের পরাজিত করার পর সে একটি গভীর ও অন্ধকার গুহার সন্ধান পায়, যেখানে রাজকন্যারা বন্দি ছিল।
পপোলভার তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কিন্তু ফেরার পথে তার বড় ভাইয়েরা চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে।
তারা পপোলভারকে এক গভীর খাদে ফেলে দিয়ে রাজকন্যাদের নিয়ে প্রাসাদে চলে যায় এবং নিজেদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে দাবি করে।
রাজকন্যারা প্রাণভয়ে সত্য গোপন রাখতে বাধ্য হয়।
তবে পপোলভারের ছিল তার বিশ্বস্ত জাদুকরী ঘোড়া।
সেই ঘোড়াটির অলৌকিক ক্ষমতায় সে প্রাণে বেঁচে যায় এবং ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়।
যখন রাজকন্যারা তাদের আসল বীর উদ্ধারকারীকে দেখতে পায়, তারা রাজার কাছে সব সত্য প্রকাশ করে দেয়।
রাজা বড় ভাইদের প্রতারণার জন্য কঠোর শাস্তি দেন এবং পপোলভারের বীরত্বকে সম্মান জানান।
‘ছাইয়ের ছেলে’ হিসেবে অবহেলিত পপোলভার তার অদম্য সাহস আর সততার জোরে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বীরে পরিণত হয় এবং রাজকন্যার সঙ্গে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।