বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফায় ক্ষমতার দশক পূর্তির মুখেই ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঝড়ের মুখে পড়েছেন সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। প্রভাবশালী ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান ফুটবল শক্তিগুলোর তীব্র অনাস্থা এবং আইনি হুমকির মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই সুইস সংগঠক এখন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
শীর্ষস্থানীয় ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তিদের বয়কটের মুখে পড়ে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে ইনফান্তিনো এখন এমন সব দেশের সমর্থন কুড়াতে ব্যস্ত, আন্তর্জাতিক ফুটবলের মানচিত্রে যাদের কোনো ঐতিহ্যই নেই এবং শাসনব্যবস্থাও মূলত অগণতান্ত্রিক।
ফিফার নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্যিক শেয়ার বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ার বিতর্কিত পরিকল্পনার পরেই মূলত ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে এই বারুদ স্তূপ জমা হয়। বিশ্ব ফুটবলের মূল চালিকাশক্তিগুলো এই পরিকল্পনাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পর ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ফিফার ওই পরিকল্পনাকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এর পাশাপাশি ওয়েলস, ইংল্যান্ড, সার্বিয়া, সুইডেনের মতো ঐতিহ্যবাহী ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি কনকাকাফের মতো শক্তিশালী মহাদেশীয় ব্লকগুলোও ইনফান্তিনোর ওপর থেকে পুরোপুরি হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
ইউরোপের এই প্রবল চাপের মুখে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের শক্তির জানান দিচ্ছেন ফিফা প্রধান। সমালোচকদের জবাব দিতে তিনি এমন কিছু দেশের ফেডারেশনের সমর্থনপত্র সামনে আনছেন, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে যাদের ওজন নামমাত্র। ও গ্লোবোর বিশ্লেষণে উঠে আসা এমন ৬টি দেশের অবস্থান বেশ প্রশ্নবিদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে মরক্কো, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটান।
ইনফান্তিনোর আঁকড়ে ধরা এই সমর্থক গোত্রটির রাজনৈতিক ও ক্রীড়া সংস্কৃতি মোটেও সুখকর নয়। এই ছয়টি দেশের মধ্যে কেবল শ্রীলঙ্কা ও ভুটানে সীমিত অর্থে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে, আর বাকি চার দেশ মরক্কো, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে একচ্ছত্র রাজতান্ত্রিক শাসন বলবৎ রয়েছে। এমনকি সম্প্রতি ইনফান্তিনো নিজে মরক্কোয় গিয়ে দেশটির রাজার সিংহাসন আরোহণের উৎসবেও অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে ফুটবলের মানের দিক থেকেও মরক্কো বাদে বাকি পাঁচ দেশের ফুটবলে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই। ভুটান ও শ্রীলঙ্কা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে ধুঁকছে, আর কুয়েত বা আমিরাত শেষবার বিশ্বকাপের দেখা পেয়েছিল বহু দশক আগে।
তবে এই সংকটময় মুহূর্তে মরক্কো এবং কাতারকে ইনফান্তিনো তার তুরুপের তাস বানিয়েছেন। ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মরক্কো আগামী ২০২৭ সালের ফিফা কংগ্রেসের আয়োজক দেশ হওয়ায় স্পেনের বুক থেকে ফাইনাল ম্যাচটি নিজেদের মাটিতে আনতে এখন ইনফান্তিনোর ছায়াসঙ্গী হয়েছে।
অন্যদিকে, কাতার বিশ্বকাপের পুরোনো নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে পিএসজি সভাপতি নাসের আল-খেলাইফির সম্ভাব্য বিদ্রোহও থামিয়ে দিয়েছেন ফিফা প্রধান। তবে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমের মতে, ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তিগুলোকে চটিয়ে দিয়ে কেবল দুর্বল ও অগণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রনির্ভর দেশগুলোর কাঁধে ভর করে ২০২৭ সালের পরবর্তী নির্বাচনে ইনফান্তিনো কতদূর টিকতে পারবেন, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন কেবলই সংশয় আর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সান্তোসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অবসরের তাড়াহুড়ো নেই নেইমারের