ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়াতে হলে নিজস্ব মিউজিক অ্যাপস প্রয়োজন

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

দীর্ঘ এক দশক ধরে স্বকীয় গায়কী ও রুচিশীল প্রযোজনা দিয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী ও ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ধ্রুব গুহ। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার আলোচিত গান ‘যে পাখি ঘর বোঝে না’ সম্প্রতি ইউটিউবে ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ভিউয়ের বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। প্লাবন কোরেশির কথা ও সুর, তরিক আল ইসলামের সংগীতায়োজন এবং শুভব্রত সরকারের পরিচালনায় নির্মিত গানটি কোটি কোটি গানপাগল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এই বিশাল অর্জন, গানের নেপথ্য গল্প এবং সংগীতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

‘যে পাখি ঘর বোঝে না’ গানটি ১০ কোটি ভিউয়ের মাইলফলক স্পর্শ করল। এই অর্জনের অনুভূতি কেমন?

এটি আমার সংগীতজীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। একটি গান যখন বছরের পর বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে থাকে, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন শিল্পীর জন্য আর কিছু হতে পারে না। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; প্লাবন কোরেশি, তরিক আল ইসলাম, শুভব্রত সরকারসহ গানটির সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের।

দীর্ঘ এক দশক ধরে গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে ধরে রাখার পেছনের রহস্য কী বলে মনে করেন?

প্লাবন কোরেশির আবেগঘন কথামালা ও হৃদয়ছোঁয়া সুর এবং তরিক আল ইসলামের অসাধারণ সংগীতায়োজনই এর মূল শক্তি। সময়ের ব্যবধানে গানটির আবেদন একটুও কমেনি, বরং নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও এটি আপন করে নিয়েছেন। ভালো গান যে কখনো পুরনো হয় না, সময়ের সঙ্গে তার আবেদন আরও গভীর হয়, গানটি যেন আবারও সেটাই প্রমাণ করল।

গানটির মিউজিক ভিডিও নিয়ে আজও আলোচনা হয়। ভিডিওটির স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাই।

শুভব্রত সরকারের চমৎকার গল্পনির্ভর নির্মাণ ও নান্দনিক চিত্রায়ণের কারণেই এটি শুরু থেকে দর্শকপ্রিয়তা পায়। এতে অভিনয় করেছিলেন মডেল তারেক ও তারিন, পাশাপাশি আমিও উপস্থিত ছিলাম। গানটির গল্পের ভেতরের যে কান্না বা আবেগ, তা ভিডিওর মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। তাই দর্শকরা সহজেই নিজেদের সঙ্গে মেলাতে পেরেছিলেন।

এত বড় অর্জনে শ্রোতা ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

এই ভালোবাসার জন্য আমি দেশ ও বিদেশের সব বাংলাভাষী শ্রোতা-দর্শকের প্রতি গভীর ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলা গানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ১০০ মিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করা গানের সংখ্যা এখনো খুব বেশি নয়। দর্শকদের এই ভালোবাসা, সমর্থন ও অনুপ্রেরণাই আমাকে প্রতিনয়ত নতুন গান করার সাহস জোগায়।

গানটির এই অভাবনীয় সাফল্যের পর শ্রোতারা আপনার কণ্ঠে নতুন কী গান পেতে যাচ্ছেন?

শ্রোতাদের ভালোবাসার দায়বদ্ধতা থেকেই ভালো কিছু তৈরি করার তাগিদ অনুভব করি। খুব শিগগিরই নতুন কিছু গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংগীতায়োজন ও সুরের কাজ চলছে, আশা করি শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পারব।

গানের পেছনের শিল্পীদের সঠিক মূল্যায়ন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি জনপ্রিয় গানের পেছনে শুধু কণ্ঠশিল্পী নন, গীতিকার, সুরকার ও সংগীতায়োজকের অবদান সমান থাকে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নেপথ্যের এই কারিগরদের উপযুক্ত সম্মান ও সঠিক রয়্যালটি নিশ্চিত করা খুব জরুরি, তবেই তারা আরও নতুন ও সৃজনশীল কাজ উপহার দিতে উৎসাহিত হবেন।

শিল্পী হিসেবে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি ‘ধ্রুব মিউজিক স্টেশন’-এর মাধ্যমে প্রযোজক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। এই পথচলা কতটা সফল মনে হয়?

ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের এই পথচলায় আমি কতটা সফল, তা নির্ধারণ করবেন শিল্পী, শ্রোতা ও শুভানুধ্যায়ীরা। তবে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি মানসম্মত ও মানসম্পন্ন কাজ উপহার দেওয়ার। দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক উন্নয়ন এবং বাংলা গান যেন একটি সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছাতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমাদের চেষ্টা নিরন্তর অব্যাহত রয়েছে।

একজন প্রযোজক হিসেবে সংগীতাঙ্গনের বর্তমান সময়টাকে কীভাবে দেখছেন?

নিশ্চয়ই বর্তমান সময়টা খুবই চ্যালেঞ্জিং, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ‘জীবন যেখানে যেমন’, কথাটিকে মানদ- ধরে এই কঠিন সময়টাকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। সংকটের মুখে দাঁড়িয়েই ফেস করতে হবে এবং মানসম্মত কাজ করে যেতে হবে। এভাবে কাজ চালিয়ে গেলে অবশ্যই আমরা ভালো কিছু করতে পারব।

আমাদের গানের বাজার আগের মতো শক্তিশালী অবস্থায় নেই। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় কী?

ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় অভাব হচ্ছে একটি নিজস্ব ও শক্তিশালী দেশীয় অডিও-ভিডিও মিউজিক অ্যাপস। বর্তমানে ‘স্বাধীন মিউজিক’ ছাড়া তেমন কোনো বড় প্ল্যাটফর্ম আমাদের নেই। এই অভাব দূর করতে আন্তর্জাতিক অ্যাপসের পাশাপাশি একটি বিশ্বমানের দেশীয় অ্যাপস থাকা অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব নয়।

এই সমস্যার সমাধানে কীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

এর জন্য মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, শিল্পী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারি, তবে শিল্পীরা সঠিক রয়্যালটি পাবেন এবং ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকবে। এ বিষয়ে জোর দিতে ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে নিয়মিত সভা, সেমিনার ও বাস্তবমুখী নীতি তৈরি করা দরকার।

সংগীত নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

গান আমার প্রাণ। যতদিন বেঁচে থাকব, মানসম্পন্ন গান গেয়ে যেতে চাই। পাশাপাশি ‘ধ্রুব মিউজিক স্টেশন’-এর মাধ্যমে নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রতিভাদের মেধা বিকাশের পথ সুগম রাখতে চাই। আমাদের লক্ষ্য বাংলা গানকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত