মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে ছুটে বেড়ানোর সুযোগ নেই। খেলাধুলা তো দূরের কথা, নিয়মিত সমাবেশও করতে পারে না শিশুরা। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানিতে ডুবে থাকা সেই মাঠ এখন শ্যাওলা, আগাছা, মশা আর আবর্জনার দখলে। পচা পানির দুর্গন্ধে ভারী হয়ে থাকে চারপাশের বাতাস। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই প্রতিদিন পাঠ নিতে হচ্ছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রানীগ্রাম-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩৮ শিক্ষার্থীকে।
উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের কাছিকাটা বাজারসংলগ্ন বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের মাঠটি নিচু হওয়ায় আশপাশের পানি এসে সেখানে জমে থাকে। কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়। বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠে পানি জমে থাকায় ধীরে ধীরে সেখানে জন্মেছে শ্যাওলা ও আগাছা। এর সঙ্গে পাশের হাটের বিভিন্ন বর্জ্য এসে জমায় পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের বিভিন্ন স্থানে থইথই করছে পানি। কোথাও পুরু শ্যাওলার আস্তরণ, কোথাও কোমরসমান আগাছা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা। পচা পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পুরো মাঠজুড়ে মশার উপদ্রবও চোখে পড়ার মতো।
শিক্ষার্থীরা জানায়, বৃষ্টি বাড়লে মাঠের পানি বিদ্যালয়ের বারান্দা পর্যন্ত উঠে আসে। তখন শ্রেণিকক্ষেও ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ। অনেক সময় পানি ও কাদার কারণে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন খেলাধুলা ও সমাবেশ বন্ধ থাকায় হতাশ তারা।
বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, মাঠটি দীর্ঘদিন কাদা ও পানিতে ডুবে থাকায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে সব সময় শঙ্কায় থাকতে হয়। অনেক সময় শিশুরা পড়ে গিয়ে পোশাক ও বই-খাতা নষ্ট করে ফেলে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চর্মরোগের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে অনেক অভিভাবকও উদ্বিগ্ন।
শুধু মাঠ নয়, বিদ্যালয়ের পুরোনো আধাপাকা টিনশেড ভবনটির অবস্থাও নাজুক। ছাদের বিভিন্ন অংশ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়, ব্যাহত হয় পাঠদান।
গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ এস এম আলমাস বলেন, স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে শিশুদের কৃমি, চর্মরোগ, খোস-পাঁচড়া এবং ঠান্ডাজনিত অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজকে জানানো হলে তিনি বালি ভরাটের মাধ্যমে মাঠ সংস্কারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আওলাদ হোসেন বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিদ্যালয়টির সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত অবগত হওয়ার পর দ্রুত পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে শিশুদের জন্য নিরাপদ এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা আর অবহেলায় যে মাঠে শিশুদের হাসি-খেলার শব্দ থাকার কথা, সেখানে এখন জমে আছে নোংরা পানি ও আবর্জনা। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কা শিক্ষক ও অভিভাবকদের।
