ব্লাউজ এখন শুধু শাড়ির অনুষঙ্গ নয়, ফ্যাশনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে এর নকশা, কাট ও কাপড়ে এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে বদলে যাওয়া ব্লাউজ নারীর ব্যক্তিত্ব ও স্টাইলের অনন্য প্রকাশ। লিখেছেন নাহিন আশরাফ
শাড়ির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে মানানসই ব্লাউজে। তাই ট্রেন্ড অনুসরণ করলেও নিজের বয়স, ব্যক্তিত্ব, শরীরের গঠন, অনুষ্ঠানের ধরন এবং স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সবচেয়ে দামি বা সবচেয়ে ট্রেন্ডি ব্লাউজ নয়, বরং যেটি পরে আপনি আত্মবিশ্বাসী ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটিই আপনার জন্য সবচেয়ে সুন্দর ব্লাউজ।
নারীর প্রিয় পোশাকের একটি শাড়ি। বিয়ে, ঈদ,পূজা, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান সব জায়গাতেই শাড়ির চাহিদা আদি ও অকৃত্রিম। তবে শুধু সুন্দর শাড়ি পরলেই হয় না, শাড়ির সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে ব্লাউজের ওপর। সঠিক ব্লাউজ একটি সাধারণ শাড়িকেও অসাধারণ করে তুলতে পারে। আবার ভুল ব্লাউজের কারণে দামি শাড়ির সৌন্দর্যও ম্লান হয়ে যায়।
সময় বদলেছে, ফ্যাশনও বদলেছে। আগে যেখানে সাধারণ গোল গলার বা থ্রি- কোয়ার্টার হাতার ব্লাউজ বেশি দেখা যেত, এখন সেখানে নানা ধরনের কাট, ডিজাইন, কাপড় ও রঙের ব্লাউজ জনপ্রিয়। তবে ট্রেন্ডের সঙ্গে নিজের বয়স, ব্যক্তিত্ব, আরাম ও অনুষ্ঠানের ধরনও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কারণ, সব ট্রেন্ড সবার জন্য মানানসই হয় না।
এখন কোন ধরনের ব্লাউজ ট্রেন্ডে
বর্তমানে মিনিমাল ডিজাইন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। অতিরিক্ত কাজ বা ভারী ডিজাইনের বদলে পরিষ্কার, পরিপাটি ও এলিগেন্ট লুকের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। বোট নেক ব্লাউজ এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজাইনগুলোর একটি। প্রায় সব ধরনের শাড়ির সঙ্গে মানিয়ে যায় এই ধরনের ব্লাউজ এবং দেখতে পরিপাটি লাগে। অফিস, দাওয়াত কিংবা উৎসব সব জায়গাতেই সহজে পরা যায়। যেকোনো শাড়ির সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। ভি-নেক ব্লাউজ লুককে একটু স্মার্ট ও স্টাইলিশ করে তোলে। বিশেষ করে সিল্ক, অর্গানজা কিংবা লিনেন শাড়ির সঙ্গে এই ডিজাইন বেশ মানিয়ে যায়।
হাই নেক ব্লাউজ এখনো ফ্যাশনে রয়েছে। যারা মার্জিত ও অভিজাত লুক পছন্দ করেন, তাদের কাছে এই ধরনের ব্লাউজের জনপ্রিয়তা রয়েছে। সিøভলেস ও ক্যাপ সিøভ ব্লাউজ তরুণীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। তবে অনুষ্ঠান, পরিবেশ এবং নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করে বেছে নেওয়া উচিত। এলবো সিøভ বা থ্রি-কোয়ার্টার হাতা এখন আবার নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। এই ধরনের ব্লাউজে একদিকে যেমন ক্লাসি লুক আনে। অন্যদিকে বেশ আরামও পাওয়া যায়।
কোন বয়সে কেমন ব্লাউজ মানায়
ফ্যাশনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তবে বয়সের সঙ্গে মানানসই ডিজাইন বেছে নিলে ব্যক্তিত্ব আরও ফুটে ওঠে। কম বয়সীরা চাইলে বিভিন্ন কাট, রঙ ও ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন। স্লিভলেস, বোট নেক, স্কয়ার নেক, ব্যাক ডিজাইন কিংবা কনট্রাস্ট ব্লাউজ তাদের ওপর বেশ মানিয়ে যায়। ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সীদের জন্য এলিগেন্ট ও পরিপাটি ডিজাইন সবচেয়ে ভালো। থ্রি-কোয়ার্টার হাতা, ভি-নেক, হাই নেক বা সাধারণ বোট নেক ব্লাউজ ব্যক্তিত্বকে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরে। চল্লিশের পর অনেকেই আরাম ও সৌন্দর্যের সমন্বয় খোঁজেন। তাদের জন্য কটন, সিল্ক বা লিনেন কাপড়ের আরামদায়ক ব্লাউজ ভালো পছন্দ হতে পারে। খুব বেশি কাটিং বা ভারী ডিজাইনের বদলে সাধারণ কিন্তু নিখুঁত ফিটিংয়ের ব্লাউজই বেশি মানানসই।
শাড়ির সঙ্গে কেমন ব্লাউজ
সব শাড়ির সঙ্গে একই ধরনের ব্লাউজ মানায় না। কাপড়, রঙ ও শাড়ির কাজ অনুযায়ী ব্লাউজ নির্বাচন করলে পুরো সাজ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। জামদানি শাড়ি হলে সলিড রঙের সাধারণ ব্লাউজ দারুণ লাগে। এতে শাড়ির নকশাই মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কাতান বা বেনারসি শাড়ির সঙ্গে একই কাপড়ের ব্লাউজ যেমন ভালো লাগে, তেমনি ভেলভেট বা ব্রোকেড ব্লাউজও খুব সুন্দর মানিয়ে যায়। লিনেন ও কটন শাড়ির সঙ্গে কটন বা লিনেন ব্লাউজ সবচেয়ে মানানসই। চাইলে কনট্রাস্ট রঙও বেছে নিতে পারেন। অর্গানজা শাড়ির সঙ্গে সাদামাটা সাটিন বা সিল্ক ব্লাউজ পরলে লুকটি আরও পরিশীলিত দেখায়। প্রিন্টেড শাড়ির সঙ্গে একই প্রিন্টের ব্লাউজের বদলে একরঙা ব্লাউজ পরলে দেখতে অনেক বেশি সুন্দর লাগে।
কোন ব্লাউজে ক্লাসি লুক
অনেকেই মনে করেন বেশি কাজ বা পাথর লাগানো ব্লাউজই সবচেয়ে সুন্দর। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি উল্টো। ক্লাসি লুকের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো সরলতা। ভালো ফিটিংয়ের একটি ব্লাউজ, পরিষ্কার কাটিং, মানসম্মত কাপড় এবং পরিমিত ডিজাইন এই চারটি বিষয় থাকলেই ব্লাউজ দেখতে অভিজাত লাগে। এক রঙের সিল্ক ব্লাউজ, বোট নেক ডিজাইন, থ্রি-কোয়ার্টার হাতা কিংবা সাধারণ হাই নেক ব্লাউজ কখনোই ফ্যাশন থেকে হারিয়ে যায় না। বছরের পর বছর এগুলো সমান জনপ্রিয়। বর্তমানে ব্লাউজে অতিরিক্ত লেইস, ঝালর বা ভারী এমব্রয়ডারির পরিবর্তে ছোট ছোট ডিটেইলস যেমন মুক্তার বোতাম, হালকা এমব্রয়ডারি বা পরিষ্কার ফিনিশিং বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রঙ বাছাইয়েও থাকুক বুদ্ধিমত্তা
আগে শাড়ির সঙ্গে একই রঙের ব্লাউজ পরার চল বেশি ছিল। এখন কনট্রাস্ট রঙের ব্লাউজ বেশ জনপ্রিয়। যেমন সাদা জামদানির সঙ্গে কালো, লাল বা সবুজ ব্লাউজ খুব সুন্দর লাগে। কালো শাড়ির সঙ্গে গোল্ডেন, সিলভার বা লাল ব্লাউজ আলাদা মাত্রা যোগ করে। আবার প্যাস্টেল রঙের শাড়ির সঙ্গে গাঢ় রঙের ব্লাউজ পুরো লুককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। তবে রঙ নির্বাচন করার সময় নিজের গায়ের রঙ নয়, বরং পুরো পোশাকের ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়াই ভালো।
আরাম ও ফিটিংস গুরুত্বপূর্ণ
ডিজাইন যত সুন্দরই হোক, ব্লাউজের ফিটিং ঠিক না হলে পুরো সাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খুব আঁটসাঁট বা খুব ঢিলেঢালা ব্লাউজ কোনোটিই ভালো দেখায় না। ব্লাউজ বানানোর সময় কাঁধ, বুক, হাতা ও কোমরের মাপ ঠিকভাবে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি এমন কাপড় বেছে নেওয়া উচিত যাতে দীর্ঘ সময় পরে থাকলেও অস্বস্তি না হয়। ফ্যাশনের পাশাপাশি আরামের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই শুধুমাত্র দেখতে সুন্দর লাগবে বলে এমন ব্লাউজ বানান, যা পরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। গরমের দিনে সুতি, লিনেন বা হালকা সিল্কের ব্লাউজ আরাম দেয়। অন্যদিকে শীতকাল বা বিয়ের অনুষ্ঠানে ভেলভেট কিংবা ভারী কাপড়ের ব্লাউজ বেছে নেওয়া যেতে পারে। কাতান, ব্রোকেট, নেটের ব্লাউজ বেছে নিতে পারেন।