সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করবে বিএনপি। রাষ্ট্রপতি পদে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এখন মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হবে নাকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চমক দেখাবেনতা আজ বিকেল তিনটায় জাতি জানতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুরে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ডেকেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দুপুরের খাবার খাবেন তিনি। এরপর বিকেল তিনটায় রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।’
দলটির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সভা ডেকেছেন। সভায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তিনি আলোচনা করতে পারেন। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে ঘোষণা আসতে পারে।’
বিএনপি মহাসচিবের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহাসচিবকে কিছুই জানাননি। কোনো আলোচনাই করেননি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও মহাসচিব কিছু জানেন না। তবে মহাসচিব দলের সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু চেয়ারম্যান মনোনয়ন দিলে দায়িত্ব পালন করবেন।’
গতকাল বুধবার দিনভর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ভিড় করেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। তারা মির্জা ফখরুলকে মন্ত্রী হিসেবে শেষবারের মতো দেখতে এসেছেন। কেউ কেউ আবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে আগাম অভিনন্দনও জানিয়েছেন। গতকাল শেষ দিন হিসেবে অনেকগুলো ফাইল আনা হয়েছিল তার স্বাক্ষরের জন্য। তবে সেগুলোতে তিনি স্বাক্ষর করতে পারেননি। বিকেলে তিনি চলে যান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সেখানে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেন। মির্জা ফখরুলের দপ্তরে আসার কারণ জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এলাকার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছি।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, সচিবালয়ে গুঞ্জন রয়েছে আজ বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পদত্যাগ করতে পারেন।
দলটির নেতারা বলেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তিনটি পদ খালি হবে। সেগুলো হচ্ছে দলের মহাসচিবের পদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ এবং সংসদ সদস্য পদ। ফলে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব এবং মন্ত্রিপরিষদে রদবদলের বিষয়টিও ছিল দিনভর আলোচনায়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল : গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনকে সামনে রেখে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদ সদস্যরাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৩ আগস্ট। জমা পড়া মনোনয়নপত্র ১৬ আগস্ট বাছাই করা হবে। আর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। ভোট শেষে গণনা সম্পন্ন করে ফল ঘোষণা করা হবে।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালন করবে নির্বাচন কমিশন। সংসদ সচিবালয়ের দেওয়া সংসদ সদস্যদের তালিকার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে নির্বাচকম-লীর ভোটার তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে ইসি জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইন ও সংবিধানের বিধান অনুসরণ করে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
ইতিমধ্যে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর জন্য দুইটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও রিজভী আহমেদ। অন্যদিকে সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের পক্ষে প্রার্থী হয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হচ্ছেন রিজভী : মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে কে হবেন দলের মহাসচিব তা নিয়ে দলে ও দলের বাইরে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হতে পারেন। এরপর দলের পরবর্তী কাউন্সিলে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করবেন দলের কাউন্সিলররা।
মির্জা ফখরুল ২০১১ সালের মার্চ মাস থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হন। এদিকে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ খালি হবে। এর বাইরে ইতিপূর্বে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত হওয়ার পর দলের স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সে হিসেবে দুটি পদ খালি হবে। এই দুটি পদে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দেওয়া হতে পারে।
এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি নিয়মিত দলের কার্যালয়ে বসতে পারছেন না। মহাসচিব মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করায় তিনি নিজেও সময় করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে রুহুল কবির রিজভী নিয়মিত কার্যালয়ে বসছেন। সারা দেশ থেকে আগত নেতাকর্মীদের সময় দিচ্ছেন। তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনছেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তিনটি পদ খালি হবে : মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তিনটি পদ খালি হবে। প্রথম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, দ্বিতীয় মহাসচিব পদ এবং তৃতীয় সংসদ সদস্য পদ। এমন পরিস্থিতিতে এই পদগুলোতে কে আসবে তা নিয়ে রয়েছে জল্পনা-কল্পনা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী দেওয়ার সম্ভাবনা কম। এখানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দায়িত্ব পালন করবেন। মহাসচিব পদে আপাতত কাউকে দেওয়া হবে না। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রিজভী। আর সংসদ সদস্য পদে মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে এই মুহূর্তে শুধু দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এর বাইরে দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতেও একটি পদ শূন্য হবে। এর আগেও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হওয়ার কারণে স্থায়ী কমিটির আরেকটি পদ শূন্য হয়। ফলে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের শূন্য দুই পদে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা থাকছে।’
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সম্ভাবনাই বেশি। আর স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামও রয়েছে।
পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই দলের নেতাকর্মীদের পাশে এখনো আছি।’