ঢাবির স্মারকের পর নতুন কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগ, হাইকোর্টে রিট 

মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে গভর্নিং বডি নিয়ে উত্তেজনা, ভাঙচুরের অভিযোগ 

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একটি স্মারকের ভিত্তিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর উত্তরার শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

বুধবার (১২ আগষ্ট) দুপুরে নতুন গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাসসহ তার সমর্থনে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাকর্মীরা হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা তৈরি হয়।

একপর্যায়ে হাসপাতালের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। পরে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. হারুন-আল-রশিদ ও কেন্দ্রীয় মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলেজের শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

কলেজসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গভর্নিং বডি পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধটি এখন শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে নেই; বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) গত ৪ আগস্ট একটি স্মারক জারি করে নতুন পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। ওই স্মারকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিটও করা হয়েছে।

ঢাবির স্মারক ঘিরে বিরোধ

সংশ্লিষ্ট নথি ও রিটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) স্মারক নম্বর ৪৭৫/ক.প. জারি করেন। এতে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন পর্ষদে চেয়ারম্যান, দুই শিক্ষক প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের পক্ষ থেকে দুই প্রতিনিধি মনোনয়নের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

এই স্মারকের আইনগত ভিত্তি নিয়েই আপত্তি তুলেছে শহীদ মনসুর আলী ট্রাস্ট। তাদের দাবি, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল আইন, ২০২২-এর ১৮(২) ও ১৮(৩) ধারা অনুসরণ না করেই পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এরপর থেকেই কলেজের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়। একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মারকের ভিত্তিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়, অন্যদিকে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ওই স্মারকের বৈধতা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়।

হাইকোর্টে রিট, তিন সপ্তাহের জবাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্তৃক ৪ আগস্ট জারি করা স্মারকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন নম্বর ১০৮৬৭/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট বিচারপতি রাজিক-আল-জালিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ রিটটির শুনানি করেন।

রিটে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই স্মারকের মাধ্যমে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে চেয়ারম্যান, দুই শিক্ষক প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের দুই প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, এ সিদ্ধান্ত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল আইন, ২০২২-এর ১৮(২) ও ১৮(৩) ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয়েছে।

শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষদের কাছে জানতে চেয়েছেন, কেন ৪ আগস্টের ওই স্মারককে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী আদেশ কেন দেওয়া হবে না। জবাব দেওয়ার জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালতের এই আদেশে ৪ আগস্টের স্মারক স্থগিত করা হয়নি এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদকে দায়িত্ব গ্রহণ থেকে সরাসরি বিরত রাখার কোনো নির্দেশও দেওয়া হয়নি। ফলে আদালত স্মারকটি বাতিল বা স্থগিত করেছেন, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। আদালত মূলত স্মারকটির বৈধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য জানতে চেয়েছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের উদ্যোগেই নতুন উত্তেজনা

হাইকোর্টে রিট বিচারাধীন থাকার মধ্যেই নতুন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১১ আগস্ট নতুন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেন। বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত শিক্ষক, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা আয়োজনের কথাও বলা হয়। সভা ও নতুন পর্ষদের কার্যক্রম ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আসায় কলেজে উদ্বেগ বাড়ে।

এর মধ্যেই দুপুরে ড্যাব নেতাকর্মীরা হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের বাধা দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে হাসপাতালের মূল ফটক ভেঙে ড্যাবের নেতাকর্মীরা ভেতরে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। অবশ্য এ ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আগেও অধ্যক্ষের কক্ষে হট্টগোল-

গভর্নিং বডি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ৪ আগস্টও কলেজে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সেদিন অধ্যক্ষের কক্ষে বহিরাগতদের প্রবেশ, হট্টগোল ও চাপ সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে ওই ঘটনার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে একাধিকবার উত্তেজনা ও প্রশাসনিক বিরোধের কারণে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও টানাপোড়েন: কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, ৫ আগস্টের পর আগের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেছেন। বর্তমানে বিএনপি-সমর্থিত ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন বলেও তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে পরিচালনা পর্ষদে আগের কমিটির কয়েকজন সদস্য এখনো রয়েছেন। আর সেটি বাংলাদেশের আইনের বলে তাড়া থাকবে। 

ফলে পুরোনো পরিচালনা পর্ষদ, নতুন কমিটি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে কলেজসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কের বাইরে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত আইন অনুযায়ী বৈধ পরিচালনা কাঠামো কোনটি এবং সেই সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কীভাবে নির্বিঘ্ন রাখা যায়।

শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ

একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রশাসনিক বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায়। কলেজসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকলে শিক্ষক-চিকিৎসকদের মধ্যে বিভাজন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বুধবারের ঘটনার পর নতুন করে সেই আশঙ্কাই সামনে এসেছে।

এখন নজর আদালতের দিকে-

সব মিলিয়ে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধ এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ আগস্টের স্মারক, সেই স্মারকের ভিত্তিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণের উদ্যোগ এবং স্মারকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে চলমান রিট।

এর সঙ্গে বুধবারের উত্তেজনা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় সব পক্ষকে আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রেখে সংযত থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত প্রশাসনিক বিরোধের একটি আইনসম্মত সমাধান হওয়া জরুরি। কারণ গভর্নিং বডি নিয়ে দ্বন্দ্ব যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব পড়বে কলেজের শিক্ষক-চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর। সর্বোপরি ঝুঁকিতে পড়বে রোগীদের চিকিৎসাসেবা।

এ অবস্থায় আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত