চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে মাদরাসা বোর্ডের ২২৬টি, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি এবং কারিগরি বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চরম এই শোচনীয় ফলাফলের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে কারণ দর্শানোর বা শোকজ নোটিশ দেওয়া শুরু করেছে।
এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ ফেল করা বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ জনের কম। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশও নেই। তাহলে কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেলো; এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষা গবেষকরা।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার শহীদ স্মৃতি গার্লস হাইস্কুল থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র পাঁচজন। তাদের সবাই ফেল করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক আছেন সাতজন। শিক্ষকরা বলছেন, নানা সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল খারাপ হয়েছে। একজন শিক্ষকের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গণিতের শিক্ষক বেতন না পাওয়ায় নিয়মিত ক্লাসে আসছেন না। এ কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও সমস্যা হয়েছে।
গাজীপুরের মেরুয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসা থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮ জন। তাদের একজনও পাস করেনি। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছেন ১৮ জন। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের অনেক অভিভাবকই পড়াশোনার বিষয়ে সচেতন নন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় ক্লাস চলাকালীন অভিভাবক এসে মেয়েদের নিয়ে যান। পরে জানা যায়, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে।
শতভাগ ফেল করা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের চিত্রও প্রায় একই। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭২ শতাংশই মাদ্রাসা।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শোকজ করছে শিক্ষা বোর্ড। ধাপে ধাপে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড সমন্বয় কমিটি। আন্তঃশিক্ষাবোর্ডের সমন্বয়ক অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা নিজেদের কোনো সমস্যার কারণে যদি এমন ফলাফল হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নূর-ই-আলম সিদ্দিকী বলেন, পুরো উপজেলায় মাত্র একজন শিক্ষা কর্মকর্তা এবং তার সঙ্গে এক বা দুইজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা থাকেন। তাদের পক্ষে পুরো জেলার সব প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এর বাইরে তাদের আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই দূর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
এবার এত শিক্ষার্থী কেন ফেল করল, সেই কারণও অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিগত সময়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর শিক্ষার মান তো দূরের কথা, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশও নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতভাগ ফেল করা এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।