বিঘা প্রতি ২০০০ টাকায় ‘পানি ভাড়া’ নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন কৃষকেরা

পাট চাষে ফলন ও দাম দুটোই মিললেও অনাবৃষ্টির কারণে জাগ দেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থায় গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা; আর এতেই কমছে কৃষকের প্রত্যাশিত লাভের পথ।

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৬ এএম

বর্ষা মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চরম পানি সংকটে পড়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার পাট চাষিরা। উপজেলার খাল-বিল ও নিচু এলাকায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সঠিক সময়ে পাট কাটা ও জাগ দেওয়া নিয়ে ঘোর বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এতে বাধ্য হয়ে কেউ পুকুর ভাড়া নিয়ে, আবার কেউ নিচু জমিতে সেচ দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে পানি জমিয়ে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। ফলে বাড়তি খরচের বোঝা গিয়ে পড়ছে কৃষকদের কাঁধে।

স্থানীয় কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমির পাট জাগ দিতে পানি ব্যবহারের জন্যই তাদের প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। কৃষকরা জানান, চলতি বছর পাটের ফলন ও বাজারের বিক্রিমূল্য দুটোই ভালো হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু জাগ দেওয়ার কারণে এই বাড়তি খরচ তাদের প্রত্যাশিত লাভ অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে।

নদীসংলগ্ন এলাকার কৃষকরা নদীতে পাট জাগ দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। তাদের বাড়তি পুকুর ভাড়া দিতে হচ্ছে না, কেবল পরিবহন খরচটুকু লাগছে। তবে এবার নদীতেও দেরিতে পানি আসায় তাদের পাট জাগ দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আর নদী থেকে দূরবর্তী এলাকার কৃষকদের সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে পুকুর ও নিচু সেচ দেওয়া জমির ওপর।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়ায় ৩ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অথচ এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮১৫ হেক্টর এবং গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ২১১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেড়েছে।

কৃষি অফিস জানায়, বিঘা প্রতি পাটের উৎপাদন হচ্ছে ৮ থেকে ১০ মণ এবং বিঘা প্রতি খরচ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। বর্তমানে এলাকায় পাট কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে খাল-বিল ও নিচু স্থানে পানি না জমার কারণে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় ও ভোগান্তি উভয়ই পোহাতে হচ্ছে।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা এলাকায় রেললাইনের পাশের নিচু এক জমিতে কোমর সমান পানি জমিয়ে পাট জাগ দিতে দেখা গেছে। জমির মালিক রাকিবুল ইসলাম চেরু জানান, অনাবৃষ্টির কারণে জমিতে স্বাভাবিক পানি না থাকায় তিনি নিজস্ব শ্যালো মেশিনের সাহায্যে সেচ দিয়ে পানি জমিয়েছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০ জন কৃষক বিঘাপ্রতি ২ হাজার টাকা চুক্তিতে পাট জাগ দিচ্ছেন।

কৃষক চেরু জানান, বৃষ্টির পানি থাকলে বিঘা প্রতি খরচ হতো মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু পানি সংকটের কারণে বাড়তি টাকা দিয়ে জাগ দিতে হচ্ছে। এলাকায় এই ভাড়ায় পাট জাগ দেওয়ার সংস্কৃতি কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে।

যুগীপাড়া গ্রামের কৃষক চাঁদ মিয়া ১ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টির আশায় থেকে শেষ পর্যন্ত না পেয়ে ২ হাজার টাকা খরচে পাট জাগ দিয়েছেন। তিনি জানান, জাগ দেওয়ার পর প্রতি আঁটি পাট ধুতে শ্রমিকের পেছনে ৩ টাকা করে খরচ হচ্ছে (একজন শ্রমিক দিনে ২৫০-৩০০ আঁটি পাট ধুতে পারেন)। তবে বাজারের বর্তমান দাম ভালো থাকায় খুব বেশি না হলেও মোটামুটি লাভের আশা করছেন তিনি।

একই এলাকার অপর কৃষক আলাউদ্দিন জানান, বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকার কারণে তাঁর ১ বিঘা জমির পাট কাটতে দেরি হয়ে গেছে। শেষমেশ তিনিও ২ হাজার টাকায় পুকুর ভাড়া করে জাগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিঘা প্রতি ৭-৮ মণ ফলনের আশা থাকলেও বপন থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত তাঁর মোট ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে বলে জানান।

এদিকে স্বাভাবিক সময়ে বর্ষার পানিতে খাল-বিল ভরে থাকলেও এখন অনাবৃষ্টির কারণে বিকল্প পুকুর ব্যবহারের ফলে পুকুরের মাছের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে অনেকেই পাট জাগ দেওয়ার আগেই পুকুরের মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

উপজেলার মালঞ্চি বাজারের পাট ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, এ বছর পাটের ফলন ও দাম দুটোই ভালো। মৌসুমের শুরুতে তারা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনলেও বর্তমানে বাজারে পাটের দর প্রতি মণ ৩৫ শত থেকে ৩৬ শত (৩,৫০০–৩,৬০০) টাকা।

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, কম বৃষ্টিপাতের দরুন অনেক এলাকায় পাট জাগে পানির কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং চাষিরা পুকুর বা নিচু জমিতে পানি জমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বর্তমানে পাট কাটা শেষের দিকে এবং কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাটের উৎপাদন ও বাজারমূল্য ভালো থাকায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত