‘দয়া চাই না, নিজের যোগ্যতায় বাঁচতে চাই’

‘‘হাত নেই বলে থমকে দাঁড়ায়নি পথ,
পা দিয়ে লিখে বুনেছেন শত শপথ।
চোখ মেলে চেয়ে আকাশের নীল পানে,
জীবন জয়ের গান গায় অদম্য প্রাণে।’’

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪০ এএম

ভোরের সোনালী আলো ফুটতেই গ্রামের কাঁচা মেঠোপথের ধারে থমকে দাঁড়ায় জীবনের নির্মম বাস্তবতা। যার জন্ম থেকেই দুটো হাত নেই, ক্যানভাসে ছবি আঁকা কিংবা হাজারো প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে বিজয়ের নিশান ওড়ানোর কথা তার ছিল না। তবে শারীরিক অক্ষমতা ও দারিদ্র্যের নির্মম পরিহাসকে পেছনে ফেলে এক রূপকথা তুল্য ইতিহাস লিখে চলেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ৭নং দিগড় ইউনিয়নের গারট্র উত্তর পাড়া (খুশিপাড়া) গ্রামের সন্তান মো. তাওহীদ ইসলাম।

পিতা মো. ফজলুল হক ও মা রত্না খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নেওয়া তাওহীদুলের শৈশবটা অন্য আর আট-দশটি শিশুর মতো সহজ-স্বাভাবিক ছিল না। সমবয়সীরা যখন হাত বাড়িয়ে শৈশবের আনন্দ কুড়াত, অবুঝ তাওহীদুল তখন অপলক চোখে নিজের খালি দুটি কাঁধের দিকে চেয়ে থাকতেন। তবে প্রকৃতির এই নির্মমতার কাছে তিনি নতি স্বীকার করেননি। পা দুটোকেই বানিয়ে নিয়েছেন হাতের বিকল্প, আর পায়ের আঙুলগুলোকে রূপ দিয়েছেন স্বপ্নের কলমে।

‘‘অশ্রু জমেছে চোখের কোণে অজস্র নিশিরাতে,
তবু কলম থেমে থাকেনি, পায়ের ওই শক্ত মুঠোতে।
ব্যথার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যিনি জিতেন দিনপ্রতিদিন,
তাঁর এই লড়াইয়ের কাছে ইতিহাস নিজেই ঋণ।’’

পায়ের আঙুলে প্রতিটি শব্দ ফুটিয়ে তোলার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে রক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণার ইতিহাস। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঙুলের ফাঁকে কলম চেপে ধরে পড়াশোনা করতে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে তা দমিয়ে রাখতে পারেনি। কণ্টকাকীর্ণ এই পথ পেরিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৩৮ জিপিএ অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ঐতিহাসিক করটিয়া সা'দত কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন তাওহীদুল।

বাবা-মায়ের চোখের জল ও দীর্ঘশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে তাওহীদুল কেবল নিজেকেই আলোকিত করছেন না, পুরো সমাজের অন্ধকার দূর করছেন। তবে তাঁর হৃদয়ের সুপ্ত আকুতিটা বড়ই করুণ।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তাওহীদুল বলেন, ‌‘আমার দুটি হাত নেই, বেঁচে থাকার তাগিদে পা দিয়েই সব লিখি। পৃথিবীর কাছে আমার খুব বেশি চাওয়া নেই; আমি শুধু নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে চাই। কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে যদি একটি সরকারি চাকরি পাই, তবে ভাঙা সংসারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারব। আল্লাহ যদি সেই সুযোগ দেন, তবেই আমার জীবন সার্থক হবে।’

‘‘হাত নেই বলে কে বলে গো তিনি একা?
তাঁর বিশ্বাসের ক্যানভাসে তো স্বর্গের আলো আঁকা।
রাষ্ট্র কি দেবে না বাড়িয়ে একটু সহানুভূতির হাত?
মুছে কি যাবে না তাঁর জীবনের এই ঘোর অমাবস্যা রাত?’’

তবে উচ্চশিক্ষার এই পথ তাওহীদের জন্য মোটেই সহজ নয়। অভাব-অনটন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ প্রতি রাতে তাঁর ঘুম কেড়ে নেয়। পা দিয়ে টানা লিখে যখন শরীর আর সঙ্গ দেয় না, তখনও তিনি আশায় বুক বাঁধেন—একদিন তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন শ্রম ও ত্যাগ সফল হবে।

তাওহীদ ইসলামের এই সংগ্রাম আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো ইচ্ছাশক্তিকে বন্দি রাখতে পারে না। এখন কেবল অপেক্ষা—একটি সরকারি চাকরি, কিছুটা সহানুভূতি এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ভালোবাসার হাত, যা এই অদম্য লড়াকুর জীবনকে পূর্ণতা দেবে।

ছেলের জন্ম মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে বাবা মো. ফজলুল হক বলেন, ‘ছেলেটা যখন জন্মাল, হাত দুটো না দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছিল। ভেবেছিলাম ও হয়তো সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। কিন্তু তাওহীদুল আমাদের ভুল প্রমাণ করেছে। পা দিয়ে লিখে যখন ভালো ফল করে, গর্বে বুক ভরে যায়। তবে আমার সামর্থ্য নেই, বয়সও হচ্ছে—ওকে একটা সরকারি চাকরি দিলে আমরা অন্তত শান্তিতে মরতে পারতাম।’

চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে মা মোছা. রত্না খাতুন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে ছেলেটার কষ্ট চোখের সামনে দেখেছি। অন্য বাচ্চারা যখন খেলত, ও তখন এক মনে পা দিয়ে অক্ষর লেখা প্র্যাকটিস করত। ব্যথায় পা ফুলে যেত, রাতে ঘুমাতে পারত না, আমি লুকিয়ে কাঁদতাম। আমার তাওহীদ কারো কাছে দয়া চায় না, ও নিজের যোগ্যতায় বাঁচতে চায়। সরকার যেন আমার এই অবুঝ ছেলেটার দিকে একটু নজর দেয়।’

এলাকাবাসীর কণ্ঠেও একই সুর। তারা জানান, ‘তাওহীদ শুধু তার বাবা-মায়ের নয়, আমাদের পুরো গ্রামের গর্ব। দুই হাত না থাকার কষ্টকে হার মানিয়ে ও যেভাবে অনার্সে পড়ছে, তা আমাদের চোখের সামনে এক অলৌকিক ঘটনা। ওর মতো মেধাবী ও সংগ্রামী ছেলেকে যদি একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা শুধু ওর একার নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত