রাবিতে পাঁচ বছরে চাকরি গেল ৫ জনের

যৌন হয়রানি, একাডেমিক দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মতো অভিযোগে ৫ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও চাকরি থেকে সরানো হয়েছে।

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গুরুতর অনিয়ম ও অভিযোগের ঘটনায় গত ৫ বছরে চার শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি, একাডেমিক দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও স্বাক্ষর জালিয়াতি। শিক্ষকদের পাশাপাশি একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানি ও একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে বরখাস্ত করা হয়।

অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি এবং একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর উচ্চতর তদন্ত কমিটির সুপারিশে তাঁকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের আগস্টে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে চেম্বারে ডেকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে। পরে ওই শিক্ষার্থীর মা বিভাগের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ তদন্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রভাস কুমারকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে তাঁর বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫৪৫তম সিন্ডিকেট সভায় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তিনি পেনশনসহ কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাবেন না।

সাদিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এর পরদিন বিষয়টি তদন্তে বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৩তম সিন্ডিকেট সভায় তাঁকে সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।

এর আগে ২০২২ সালের ২৯ মে রাতে অনুষ্ঠিত ৫১৪তম সিন্ডিকেট সভায় অনিয়মের অভিযোগে আরও দুই শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাঁরা হলেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুন।

উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অনুমতি ছাড়া ছুটিতে থাকা এবং ছাড়পত্র না নিয়ে বিদেশে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হলে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তাঁকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।

অধ্যাপক সালমা খাতুনের বিরুদ্ধে সুপারভাইজার ও চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার অভিযোগ ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।

শিক্ষকদের বাইরে গত ৫ বছরে রাবির চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০২৪ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত ৫৩১তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত