ঋণের বোঝা পেরিয়ে ‘বাইকুনুর’ আঙুরে স্বপ্ন বুনছেন মুন্না

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

একসময় ব্যবসায় লোকসান গুনে প্রায় ১০ লাখ টাকার ঋণে ডুবে গিয়েছিলেন মিজানুর রহমান মুন্না। সামনে তখন অনিশ্চয়তা, পেছনে ব্যর্থতার চাপ। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। চাকরির পেছনে না ছুটে ফিরে গেছেন মাটির কাছে। আর সেই মাটিই এখন তাকে দেখাচ্ছে নতুন পথ।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চরকাদহ গ্রামের এই তরুণ দুই বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন বিদেশি জাতের আঙুরবাগান। রাশিয়ান ‘বাইকুনুর’ জাতের ৪০০টি চারা দিয়ে শুরু করা সেই বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে আঙুর। সবুজ ফল ধীরে ধীরে রং বদলাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে মুন্নার জীবনের হিসাবও।

লেখাপড়া শেষ করেও প্রচলিত চাকরির পথে হাঁটেননি মুন্না। ২০১৪ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে ডিপ্লোমা শেষ করেন। এরপর ব্যবসায় নামলেও কয়েক মাসের মধ্যেই বড় লোকসানের মুখে পড়েন। ঋণের বোঝা তাকে থামিয়ে দেয়নি, বরং নতুন কিছু করার তাগিদ আরও বাড়িয়ে দেয়। 

পরবর্তী সময়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষি ও খাদ্যসংক্রান্ত তিন মাসের একটি প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখান থেকেই কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ে। ইউটিউবে বিভিন্ন ফলের বাগান ও সফল উদ্যোক্তার গল্প দেখে আঙুর চাষের প্রতি আগ্রহী হন। পরে নওগাঁর মান্দায় গিয়ে একজন সফল আঙুরচাষির কাছ থেকে পরামর্শ নেন।

পরিবারের অনীহা সত্ত্বেও বাড়ির পেছনের দুই বিঘা জমি প্রস্তুত করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে নওগাঁ ও যশোর থেকে ৪০০টি ‘বাইকুনুর’ জাতের চারা সংগ্রহ করেন মুন্না। নিয়মিত পরিচর্যা, ছাঁটাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে।

সম্প্রতি চরকাদহে মুন্নার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লতার নিচে ঝুলছে আঙুরের থোকা। কোনো কোনো থোকা বেশ বড়, কিছু ফল সবুজ, আবার কিছুতে লালচে-বেগুনি আভা দেখা দিয়েছে। বাগান দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। কেউ আঙুর চাষের পদ্ধতি জানতে চাইছেন, কেউ আবার চারা সংগ্রহ করছেন।

মুন্না জানান, প্রতিটি চারা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। চারা বিক্রির পাশাপাশি আগ্রহী কৃষকদের জমি প্রস্তুতি, রোপণ ও পরিচর্যার বিষয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন তার কাছ থেকে চারা নিয়ে ছোট পরিসরে আঙুর চাষ শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, আমার ওপর ১০ লাখ টাকার বেশি ঋণ আছে। কিন্তু আমি কখনো আশা ছাড়িনি। এই বাগানটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় ভরসা। যদি ঠিকমতো ফল বাজারজাত করতে পারি, তাহলে সামনে আরও বড় পরিসরে আঙুর চাষ করতে চাই। 

মুন্নার হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চারা ও ফল বিক্রি মিলিয়ে সাত লাখ টাকার বেশি আয় হতে পারে। বাজার ভালো থাকলে প্রতি কেজি আঙুর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রির আশা করছেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও দুই বিঘা জমিতে বাগান সম্প্রসারণের ইচ্ছা থাকলেও অর্থসংকট বড় বাধা হয়ে আছে।

কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মুন্নার। বাবার সঙ্গে মাঠে যাওয়া, ফসলের পরিচর্যা দেখা—এসব অভিজ্ঞতা তাকে কৃষির দিকে টেনে এনেছে বলে জানান তিনি।

মুন্নার ভাষায়, চাকরি করতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে কৃষিতেও সম্মানের সঙ্গে দাঁড়ানো যায়। আমি চাই এলাকার তরুণেরা শুধু চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাও কিছু শুরু করুক।

তবে আঙুর চাষের সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলছেন তিনি। উপযুক্ত পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সময়মতো প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ এবং কারিগরি পরামর্শ না পেলে নতুন চাষিদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই আঙুর চাষে আগ্রহীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের নিয়মিত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

গুরুদাসপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মুন্না কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তার বাগান অন্য কর্মপ্রত্যাশী তরুণদেরও উৎসাহিত করতে পারে। প্রয়োজন হলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে সহায়তার সুযোগ বিবেচনা করা হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম রাফিউল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি জাতের আঙুর চাষ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। গুরুদাসপুরে মুন্নার এ উদ্যোগ ইতিবাচক। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ঋণের হিসাব এখনো মুন্নার খাতা থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু সেই হিসাবের পাশেই জন্ম নিয়েছে আরেকটি অঙ্ক—সম্ভাবনার। দুই বিঘা জমির লতায় ঝুলে থাকা আঙুরের থোকাগুলো তাই শুধু একটি ফলের বাগান নয়, এগুলো একজন তরুণের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, আর গ্রামীণ কৃষিতে নতুন পথ খোঁজার গল্প।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত