কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল ওয়ার্ল্ড আরচারির এশিয়া অঞ্চলের সভাপতি এবং বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সভাপতিরও দায়িত্বে। তার নেতৃত্বে দেশে আরচারির পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এসেছে একাধিক সাফল্য। সম্প্রতি ফেডারেশনের নির্বাচন, জাতীয় দলের প্রস্তুতি, অলিম্পিক পদকের স্বপ্ন, নতুন প্রজন্মের আরচার এবং ২০৩২ অলিম্পিককে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সিনিয়র রিপোর্টার
ওমর ফারুক রুবেল’র সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি
আরচারিতে এত দ্রুত নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে কীভাবে?
চপল : কোনো কাজই একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় হয় না। সবকিছুই আমাদের সম্মিলিত কর্মকা-ের ফল। আমরা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করি বলেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং তা বাস্তবায়নও সম্ভব হয়। যেমন, এখন আমাদের বাংলাদেশ দল বাইরে যেতে পারছে না, সামনে কোনো টুর্নামেন্টও নেই। তাই এমন একটি দেশকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর চিন্তা করেছি, যারা ভালো করছে এবং দ্রুত এখানে আসতে পারবে। আমরা ভুটানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তারা ২৪ আগস্ট এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশে আসবে।
আপনি সবসময় সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে চান না। কারণ কী?
চপল : উদ্যোগ নিতে হয়, এটা স্বাভাবিক। তবে আমি কখনো এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিই না। সাধারণত প্রস্তাব রাখি, এটা করলে কেমন হয়? আমাদের সাধারণ সম্পাদকও বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। বিদেশি কোনো দলকে এনে খেলার চিন্তাটিও সেখান থেকেই এসেছে। জাতীয় দলের সঙ্গে জাতীয় দল খেললে সবাই সবাইকে চেনে, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা কম হতে পারে।
আপনি যখন বাংলাদেশে আরচারি শুরু করেছিলেন, তখন আর এখনকার আরচারি কতটা বদলেছে?
চপল : স্বপ্ন না থাকলে কোনো কাজই শুরু করা যায় না। তবে এমন স্বপ্ন দেখতে হয়, যেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। শুরু থেকেই আমরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছি। তখন অভাব-অনটন ছিল, কষ্ট ছিল। একটা শিশু যেমন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, একটি খেলাও সেভাবেই ধাপে ধাপে এগোয়। আমাদের প্রথম দিকের খেলোয়াড়রা যে পরিবেশে অনুশীলন করেছেন, আর এখনকার সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কমলাপুর স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে আজ আমরা নিজেদের আরচারি স্টেডিয়াম পেয়েছি। সফলতার জন্য উদ্যোগ দরকার, সেই উদ্যোগ আমরা নিয়েছি।
আরচারিতে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক। তারপরও কি মনে হয়, আমাদের যে জায়গায় থাকার কথা ছিল সেখানে এখনো যেতে পারিনি?
চপল : আফসোসের তো সীমা থাকে না। আপনি যখন একটি অর্জন করবেন, তখন পরের অর্জনের জন্য আফসোস থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। আমরা যত অর্জন করেছি, তার চেয়েও বেশি অর্জনের স্বপ্ন দেখি। এখন আমাদের লক্ষ্য আরও বড়। বিশেষ করে অলিম্পিকে পদক জয়ের স্বপ্ন আমরা দেখছি।
অলিম্পিক পদক জয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একজন খেলোয়াড়ের পেশাগত ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করতে হবে। তাই নয় কী?
চপল : পেশাদারিত্ব দিতে হলে আগে নিজেকেই পেশাদার হতে হবে। নিজের যোগ্যতা ও পেশাদারিত্ব প্রমাণ করতে পারলে মানুষও আপনাকে সুযোগ দেবে। রাষ্ট্রও এখন সে উদ্যোগ নিয়েছে। ‘ক্রীড়া হোক পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’, এই ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন পরিবারেরও দায়িত্ব আছে। বাবা-মাকে সন্তানকে কীভাবে গড়ে তুলবেন, সেই উদ্যোগ নিতে হবে।
দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদক থাকার পর এখন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি কীভাবে উপভোগ করছেন?
চপল : এটা আমার জীবনের একটি দারুণ ইন্টারেস্টিং অবস্থান। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অনেক বছর কাজ করেছি। এরপর সদস্য হয়েছি, এখন সভাপতি। তবে আমার লক্ষ্য পরিষ্কার ভালো একটি ফলাফল রেখে বিদায় নিতে চাই। বদনাম নিয়ে নয়, বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিতে চাই। ২০৩২ সালের অলিম্পিক পর্যন্ত আমরা একটি রূপরেখা তৈরি করেছি। আমি এমন একটি সিস্টেম তৈরি করে যেতে চাই, যাতে আমি না থাকলেও সেটি কার্যকর থাকে।
রোমান সানা, দিয়া সিদ্দিকীদের পর নতুন প্রজন্ম কি সেই মান ধরে রাখতে পারছে?
চপল : আমি বলব, আমরা পিছিয়ে যাইনি। রোমান সানা বা দিয়ার মতো খেলোয়াড় সবসময় পাওয়া যাবে না। একজন চলে গেলে আরেকজনকে তৈরি হতে সময় লাগে। সাগর ইসলাম এরই মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছে। খেলার মানও বাড়ছে। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ অনেকটা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মতো কঠিন। তাই বাংলাদেশকে হিসাবের বাইরে রাখা ঠিক হবে না। সাগর ইসলাম, আলিফ যে কেউ যেকোনো সময় ঝলসে উঠতে পারে।
নেপাল এসএ গেমসে ১০টি স্বর্ণ জিতেছিল। এবার বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে?
চপল : সবকিছুরই একটি হিসাব থাকতে হয়। ১০টি স্বর্ণ হয়তো এখনই সম্ভব নয়, তবে ৫০ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব। আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা ঠিক থাকতে হবে। বাংলাদেশের সাফল্য শুধু রোমান সানা বা দিয়ার কারণে নয়। তাদের আগেও মিলনসহ অনেকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। আজ আমাদের জিয়া সৌদি আরব জাতীয় দলের কোচ, সাজ্জাদ দুবাইয়ের শারজাহর কোচ, হাসান চৌধুরীও ক্লাব পর্যায়ে কাজ করছেন। আমাদের তৈরি করা মানুষরাই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করছেন এটিও বড় সাফল্য।
বাংলাদেশের আরচারিকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?
চপল : ব্যক্তিনির্ভর কোনো কিছুই ভালো নয়। নেতৃত্ব ঠিক থাকতে হবে এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। তাহলেই উন্নয়ন সম্ভব। আমরা সবাইকে নিয়ে চলতে চাই এবং সিদ্ধান্তও সম্মিলিতভাবে নিতে চাই। যাতে একজন ব্যক্তি চলে গেলেও সিস্টেম থেমে না যায়। ধারাবাহিক পরিকল্পনা, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরচারি আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।