পেশায় অবিচল ছিলেন সাংবাদিক দেবাশীষ

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ এএম

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার হোটেলে অগ্নিকা-ের ঘটনায় স্ত্রী-পুত্র, শ^শুরসহ নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ বাংলাদেশিদের মরদেহ আজ শনিবার দুপুর নাগাদ দেশে আসছে বলে নিশ্চিত করেছে নিহতের পরিবার। এদিকে দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মফস্বল শহরে বসবাস করা একজন পেশাদার সৎ সাংবাদিকের দৈন্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।

 অগ্নিকা-ে মৃত্যুর পর যারাই সাংবাদিক দেবাশীষের খোঁজ নিতে গেছেন, তারা জেনে অবাক হয়েছেন দুর্বিষহ দৈন্যতার মধ্যে থেকে সৎভাবে জীবনযাপন করে গেছেন তিনি। প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করে তিনি মানুষের প্রতি দায়বোধের সাংবাদিকতা করেছেন। সহায় সম্বলহীন ছিলেন। তারপরও পেশায় অবিচল ছিলেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। যেখানে থাকতেন সেটি দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি ভাড়াটে বাসা। মাস শেষে চাকরির বেতন হিসেবে যা উপার্জন হতো তা দিয়ে কোনোমতে দিন কাটত তার পরিবারের। কার্ডিয়াক রোগী পিতামাতার একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান দেবাশীষকে হারিয়ে একদিকে শোকে ন্যুব্জ, অন্যদিকে অনিশ্চিত অন্ধকারে বিপন্নের মুখে পরিবারটি। বিপর্যস্ত পরিবারটির সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জেলার সাংবাদিক মহলের।

দেবাশীষের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল কুষ্টিয়া শহরের আলো ভবনের সিঁড়ি ঘরের নিচে বিভিন্ন মিডিয়ার লোগো মোড়ানো ছোট্ট একটা স্পেসে কাচের দেয়ালঘেরা কক্ষের টেবিলের ওপর নীরব নিথর পড়ে আছে তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ, চশমাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। আছে সাংবাদিকতার নানা বই, সম্মাননা স্মারক, নিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকার আর্কাইভ। নেই শুধু এসব কর্মযজ্ঞের কারিগর সাংবাদিক দেবাশীষ।

ওদিকে ভাড়াটে বাসায় চলছে স্বজনদের শোকের মাতম। ভেঙে পড়েছে মা স্বপ্না দত্ত ও বাবা দিলীপ দত্ত। নির্বাক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সাংবাদিক দেবাশীষের শিশুকন্যা মোহিমা।

এ সময় মা স্বপ্না দত্ত বলেন, ‘আমার কি হবে? আমার সংসারের হাল ধরবে কে? আমার চিকিৎসার খোঁজ নেবে কে? আমার সংসার বলতে আর কিছুই থাকল না। আমি এখন ভাসা পানা। আমার সোনা আমাকে এভাবে ফাঁকি দিয়ে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দিল’ বলতে বলতে মূর্ছা যান।

বাবা দিলীপ দত্ত জানান, ‘দেবাশীষই আমার সংসারের একমাত্র প্রদীপ। ও নাই আমার সংসার বলেন আর চারপাশ বলেন সব এখন অন্ধকার’। আমাদের দুজনার কার্ডিয়াক রোগের ওষুধ লাগে মাসে ১০ হাজার, বাসার ভাড়া দিতে হয় ৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া রয়েছে সংসার খরচ। আমার চোখের সামনে এখন অন্ধকার। আমি সরকার এবং সাংবাদিক মহলের কাছে ওর ছোট্ট শিশুকন্যা মোহিমাকে নিয়ে বেঁচে থাকার আবেদন করছি’।

সাংবাদিক নেতা মজিবুল সেখ বলেন, ‘দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার বিপর্যস্ত সহায় সম্বলহীন পরিবারে দুর্দশার চিত্র সত্যিই সাংবাদিক মহলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে মৃত্যুর পর আপাদমস্তক পেশাদারি একজন মফস্বল সাংবাদিকের পরিবারে কি ধরনের দৈন্যদশা, ভোগান্তি ও অনিশ্চিত অন্ধকার নেমে আসে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে সাংবাদিক পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু জানান, ‘নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মা-বাবা ও শিশুকন্যার আগামী ভবিষ্যৎ জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যা কিছু প্রয়োজন তার জন্য সর্বোচ্চ প্রয়াস অব্যাহত থাকবে এবং জেলার সর্বস্তরের সাংবাদিকদের সমন্বিত উদ্যোগে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত