পায়ে লিখে এমবিএ পাস

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ এএম

জন্ম থেকেই দুটি হাত ছিল না মো. আলীর। কারও সহায়তা ছাড়াই পায়ে লিখে গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে এমবিএ (ব্যবস্থাপনা) পাস করেছেন। এখন লক্ষ্য একটি চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী হওয়া। যাতে পরিবারের কারও বোঝা হতে না হয়। ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির আবেদন করেছেন। লোহাগাড়া উপজেলার ইউএনও, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছেন সম্প্রতি। কিন্তু আশ্বাস পেলেও চাকরি এখনো মেলেনি।

মো. আলী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দুর্গম হরিদাঘোনা এলাকার বাসিন্দা আমিন শরীফ ও সামশুন নাহারের ছেলে। প্রতিবন্ধী হিসেবেই জন্ম। তার নিজের ভাষায়, ‘হাত ছাড়া জন্ম নেওয়ার কারণে মাকে শুনতে হয়েছে নানা কটু কথা। মা লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হতে পারি। সমাজের বোঝা যেন না হই। মূলত মায়ের অনুপ্রেরণায় দুই বছরের চেষ্টায় পায়ে লেখা শিখে আজ আমি বিবিএ-এমবিএ পাস করেছি। তবে এখন কিছুটা হতাশ।’

তিনি বলেন, এত কষ্ট করে এতদূর এসেছি। এখন মা-বাবা ও পরিবারকে নিয়ে সৎভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি চাকরি চাই। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমাদের মতো প্রতিবন্ধীদের গুরুত্ব তেমন নেই। যোগ্যতা থাকলেও একটি চাকরি পাচ্ছি না। একটি চাকরির জন্য কারও সহযোগিতা পাচ্ছি না। আর কত বছর অপরের বোঝা হয়ে থাকব?

আলী জানান, ইতিমধ্যে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে চাকরির বিষয়টি অবহিত করেছেন। তারা বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ একাধিক দপ্তরে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো কর্মসংস্থান হয়নি। দুটি হাত না থাকার কারণে কোনো সুযোগ মিলছে না।

আলীর প্রসঙ্গে মা সামশুন নাহার বলেন, ছেলেটি দুটি হাত ছাড়া জন্ম নেওয়ার পর প্রচ- হতাশ হয়েছিলাম। প্রতিবেশীরা মনে করত তাকে দিয়ে কিছুই হবে না। তাকে আমি পা দিয়ে লেখা শেখালাম। হাত না থাকায় কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিচ্ছিল না। তবে উত্তর বড়হাতিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান আলীর পায়ে লেখা দেখেই তাকে স্কুলে ভর্তি করেন। ছেলেটি এত কষ্ট স্বীকার করে লেখাপড়া করল, কিন্তু একটি চাকরির জন্য নানাজনের কাছে ধরনা দিয়েও পাচ্ছে না। এটা খুব কষ্ট লাগছে।

লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রিদুয়ানুল করিম বলেন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসে আলীর মতো শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি দেওয়ার কোনো নির্দেশনা এখনো নেই। আমরা কেবল তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দিচ্ছি।

এ ব্যাপারে যে কোনো প্রতিষ্ঠান সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আলী প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক এডিসন কান্তি দে বলেন, ধারাবাহিকভাবে, কারও সহযোগিতা ছাড়াই আলী পায়ে লিখে এমবিএ পাস করেছে। এটা অবশ্যই একটা কঠিন ব্যাপার। এখন সরকার যদি তাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে তাহলে ছেলেটি মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। রাষ্ট্রের উচিত এ ধরনের সফল প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, আলী প্রতিবন্ধিতা জয় করে পায়ে লিখে এমবিএ পাস করেছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তার সফলতার গল্প অনেককেই অনুপ্রাণিত করবে। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে কোনো স্থায়ী চাকরি দেওয়া যায় কি না সে চেষ্টা করব। যাতে আলী স্বাবলম্বী হতে পারেন।

উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে শিক্ষা বৃত্তি পান মো. আলী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত