ভালুকায় ২০ ফ্যাক্টরি ছুটি, বন্ধ হওয়ার পথে অনেক মিল

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৪ এএম

ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাস সরবরাহ অপ্রতুল ও প্রেসার কম থাকায় শিল্প এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার উপজেলায় ২০টি ফ্যাক্টরি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় অনেক মিল মালিক মিল বন্ধে করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।  

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে কাজে যোগ দেওয়া শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যেই ধাপে ধাপে ছুটি দিয়ে দেয় অন্তত ২০টি কারখানা। শিল্প পুলিশ-৫ এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলো। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টি বন্ধ রয়েছে। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সেও উৎপাদন ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। এছাড়া এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে প্রায় ৪০ শতাংশ মেশিন অচল হয়ে পড়েছে। এক্সিলেন্ট সিরামিকসের ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন নেমে গেছে অর্ধেকের নিচে।

শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল জানান, গ্যাস সংকটের কারণে ছুটি দেওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল ও বিএসপি স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) শামীম হোসেন বলেন, ভালুকা এলাকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআইয়ের দুটি লাইনে গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিনের সংকটের কথা জানানো হয়েছে। গ্লোরি টেক্সটাইলের ইউটিলিটি ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ জানান, দেড় থেকে দুই মাস ধরে নির্ধারিত ১৫ পিএসআইয়ের পরিবর্তে মাত্র ১০ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। ভালুকার মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে দ্রুত স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট-বড় সাড়ে তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯০টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৩০টি ডাইং ফ্যাক্টরি। গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল ও প্রেসার কম থাকায় ডাইং মিলগুলোর উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। তাই আর্টি কম্পোজিট, গ্লোরি স্পিনিং মিল, লাবিব মিল, কনজিউমার নিটেক্স লিমিটেড, টিএম টেক্সটাইল ও শেফার্ড ইয়াং ডাইংসহ প্রায় ৩০টি ডাইং মিলে দিনের বেলা গ্যাসের লাইন চালু থাকলেও প্রেসার কম থাকায় মেশিন চালাতে পারছে না মিল কর্তৃপক্ষ। গ্যাসের প্রেসার কম ও সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক ব্যবস্থাপকরা প্রতিকার চেয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বরাবর গ্যাস সরবরাহের আবেদন করেন। আগে গ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মিল চালানো হতো। গ্যাসের চাপ কম থাকলে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ অথবা ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে মিল চালানো হতো। বর্তমানে গ্যাস সংকট, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় উৎপাদন খরচ ব্যাপক বেড়েছে। সাড়ে ৩০০ শ্রমিকের একটি মিলে আগে সারা দিনে বিদ্যুতের জন্য ১/২ লিটার ডিজেল লাগত। বর্তমানে গড়ে ১৬/১৭ লিটার লাগছে।

হাজীর বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মালেক জানান, মিল বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। ফলে দেশে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই বেড়ে যেতে পারে।

শেফার্ড গ্রুপের জিএম মোকলেছুর রহমান জানান, ‘এ মিলটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। বর্তমানে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে মালের সঠিক কালার পাচ্ছি না এবং সঠিক সময়ে উৎপাদন করতেও পারছি না। ফলে বায়ারদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ হচ্ছে। এবং শ্রমিকদের বেতনও ঠিকমতো দিতে পারছি না।’

টি এম টেক্সটাইলের জেনারেল ম্যানেজার দুর্জয় কুমার সাহা জানান, ‘গ্যাসের প্রেসার না থাকায় ধাপে ধাপে আমাদের অর্ধেক সেকশন ছুটি দিয়ে দিই। বয়লার, ডাইং, ফিনিশিং ইঞ্জিন গ্যাসে চলে। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কম হচ্ছে। আমাদের এখানে সাড়ে ৫ হাজার শ্রমিক রয়েছে। মাল উৎপাদন করতে না পারায় এবং সঠিক সময়ে সরবরাহ করতে না পারায় শ্রমিকদের বেতন দিতেই কষ্ট হচ্ছে।’

এস এন এস সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পরিচালক সুমন আহাম্মেদ বলেন, ‘আমরা লাইনে সারা রাত গ্যাস পাচ্ছি না। ব্যবসা কীভাবে করব। দিনের বেলা যা পাচ্ছি তাতে প্রেসার কম।’

তিতাস গ্যাস ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ম্যানেজার প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০টি ফ্যাক্টরিতে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আমাদের মেইন লাইনে পিএসআই কিছু কম। সমস্যাটি শুধু ভালুকার নয়, সারা দেশের। খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত