শুকিয়ে যাওয়া খালে পদ্মার পানি: কৃষকদের মুখে তৃপ্তির ছাপ

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে মৃতপ্রায় হয়ে থাকা খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বছরের পর বছর পানির তীব্র সংকটে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে কৃষকদের যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো, এবার খালগুলোতে সরাসরি পদ্মার পানি প্রবেশের মাধ্যমে সেই ভোগান্তির অবসান ঘটেছে। উন্নত মানের পাট উৎপাদন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনায় এলাকার কৃষকদের চোখে-মুখে এখন তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট।

উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ফৈজদ্দিন মাতুব্বর পাড়া সংলগ্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এক কর্মচাঞ্চল্যকর চিত্র। একসময় নাব্যতা হারিয়ে ভরাট হয়ে যাওয়া খাল দুটি খননের পর ফিরে পেয়েছে আগের রূপ। বর্ষার ভরা মৌসুমে প্রমত্তা পদ্মা নদী থেকে সহজেই পানি প্রবেশ করায় খালের প্রতিটি অংশ এখন থইথই জলে পূর্ণ। কৃষকরা স্বচ্ছ সেই পানিতে দলবেঁধে পাট জাগ দেওয়া ও নিখুঁতভাবে আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সার্বিক বাস্তবায়নে এবং গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি এই দুটি খালের পুনঃখনন কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের আওতায় হাবিল মন্ডল পাড়ার কালামের বাড়ি থেকে ফৈজদ্দিন মাতুব্বর পাড়ার সলিম মাতুব্বরের বাড়ি পর্যন্ত ৯৩০ মিটার এবং গোয়ালন্দ নাজিরউদ্দিন সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিশ্বনাথপাড়া বেড়িবাঁধ পর্যন্ত ১ দশমিক ৬৮০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ২ দশমিক ৬১০ কিলোমিটার খাল সফলভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় এই প্রকল্প দুটির বিপরীতে প্রাক্কলিত বরাদ্দ ছিল ৫৮ লাখ ৭৫ হাজার ২২ টাকা। কাজের মান ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে নির্ধারিত সময় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর হিসাব-নিকাশ শেষে ৯ লাখ ৯৭৬ টাকা উদ্বৃত্ত হিসেবে সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিষয়টিকে স্থানীয় প্রশাসনের সুশাসন ও আর্থিক জবাবদিহিতার এক অনুকরণীয় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রকল্পের সুফল পেয়ে উচ্ছ্বসিত হাবিল মন্ডল পাড়া এলাকার কৃষক সৈকত শেখ বলেন, আগে পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হতো। দূর-দূরান্তে গিয়ে পাট পচানোর কারণে অতিরিক্ত পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ মেটাতে হতো। এখন বাড়ির ঠিক পাশেই পানির পর্যাপ্ত সংস্থান থাকায় অনায়াসে পাট জাগ দিতে পারছি, যা আমাদের আর্থিক দিক থেকেও লাভবান করেছে।

একই এলাকার ফৈজদ্দিন মাতুব্বর পাড়ার কৃষক বাতেন শেখ বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি দেড় একর জমিতে পাট চাষ করেছেন। অতীতে অন্যের পুকুর ভাড়া নিয়ে নিজের মটর দিয়ে পানি তুলতে হতো অথবা নদী পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া করে পাট নিয়ে যেতে হতো। খালটি পুনঃখননের ফলে সময় ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সেই বড় ধাক্কা থেকে তারা রেহাই পেয়েছেন।

কৃষিকাজে সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় খালের দুই পাড়জুড়ে সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে, যা পুরো এলাকায় একটি মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ গড়ে তুলেছে।

উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. গোলজার হোসেন মৃধা জানান, খাল পুনঃখননের ফলে স্থানীয় কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ভারী বর্ষার সময় ফসলি জমির অতিরিক্ত পানি দ্রুত খালে নেমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দূর হচ্ছে। অন্যদিকে খরা বা পাট মৌসুমে খালের পানি সংরক্ষণ করে কৃষকরা তা বহুমুখী কাজে ব্যবহার করছেন। তিনি সরকারের এই ধরনের সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবু বকর জানান, প্রকল্পের পরিধি তুলনামূলক ছোট হলেও এর কাজের মানে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত ফ্রেমওয়ার্ক ও মান বজায় রেখেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খনন কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন করা হয়েছে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা জানান, তিনি এই কর্মস্থলে যোগদানের আগেই সাবেক ইউএনও সাথী দাসের সময় খাল পুনঃখননের মূল কাজ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি সরেজমিনে পুরো এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, এই উন্নয়ন কেবল কৃষির উৎপাদনশীলতাই বাড়াচ্ছে না বরং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। খালের পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সুরক্ষায় আরও টেকসই বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং জনস্বার্থে এ ধরনের কৃষি-বান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রম আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত