নাজিরপুর-বৈঠাকাটা

সড়ক সংস্কার না করেই অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ: ব্যয় ৪৪ কোটি

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়ক।

প্রায় ১৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সংস্কারে প্রায় ৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, কোন কাজ না করেই এলজিইডি পিরোজপুরের ততকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের সহযোগীতায় প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিকে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির অধিকাংশ অংশ এখন বেহাল। পিচ ও খোয়া উঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। বর্ষায় এসব গর্তে পানি জমে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এ পথে চলাচলকারী হাজারও মানুষ। পাশাপাশি জেলার অন্যতম বড় ভাসমান সবজির বাজার বৈঠাকাটার সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ গ্রামীণ সড়ক ও বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের (বিডিআরইডব্লিউএসপি) আওতায় নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কের উন্নয়নে মেসার্স ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ দেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় চারটি প্যাকেজে ১৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার কার্পেটিং সড়ক, শূন্য দশমিক ৬ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক এবং ৩৩টি কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল। ২০২৩ সালের জুনে কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। বরং সড়কের মূল উন্নয়নকাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় ও দুদক সূত্রের অভিযোগ, কাজের তুলনায় বড় অঙ্কের অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তোলন করেছে।

এলজিইডির নাজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জিয়ারুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তার কাজে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ঠিকাদার তুলে নিয়ে গেছে। দৃশ্যমান কোন কাজ না করেই অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি তদন্তাধীন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ ও খোয়া উঠে গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর পিচের অস্তিত্বও নেই। বড় বড় গর্তের কারণে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে।
বর্ষায় গর্তগুলো পানিতে ভরে যাওয়ায় অনেক সময় সড়কের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানান। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে সড়কে ধুলাবালির কারণে দুর্ভোগ বাড়ে পথচারী ও যাত্রীদের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ১৫ বছর ধরে সড়কটির উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

শাখারিকাঠি এলাকার বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, এই সড়কে ইজিবাইক, ভ্যান ও রিকশা চলাচল করে। রাস্তা ভাঙা থাকায় গাড়িতে উঠলে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, আগে নাজিরপুর যেতে ৩০ মিনিটেরও কম সময় লাগত। এখন একই পথে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

অটো রিকশা চালক মুক্তা শিকদার বলেন, রাস্তার কারণে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। এতে নিয়মিত গাড়ি মেরামত করতে হয়। রাস্তা ভাঙাচোরা হওয়ায় অনেক যাত্রীও গাড়িতে উঠতে চান না।
তার দাবি, আগে যেখানে গন্তব্যে পৌঁছাতে ২৫ মিনিট সময় লাগত, এখন সেখানে যেতে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে।

শাখারিকাঠি গ্রামের বাসিন্দা আজমল সরদার বলেন, শুনেছি রাস্তার টেন্ডার হয়েছিল। কিন্তু কাজকর্ম তো কিছুই হয়নি। এখন আমাদের ভোগান্তির মধ্যেই চলতে হচ্ছে।

এদিকে কৃষিপণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কটি শুধু পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের পথ নয়; এটি জেলার অন্যতম বড় ভাসমান সবজির বাজার বৈঠাকাটার সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক। সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয়ের মুখে পড়ছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন, বিল পরিশোধ এবং মাঠপর্যায়ে কাজের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দ্রুত নতুন করে সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হবে। এতে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি বৈঠাকাটা বাজারের সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের যোগাযোগও স্বাভাবিক হবে।

দুদকের মামলায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিরোজপুরে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে মেসার্স ইফতি ইটিসিএলসহ মোট আটটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল মামলা করে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে,(বাংলাদেশ গ্রামীণ সড়ক ও বাজার উন্নয়ন প্রকল্প) বিডিআরইডব্লিউএসপি প্রকল্পসহ এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

দুদকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলো তদন্তাধীন এবং অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

পিরোজপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, তাদের পরিবারের সদস্য এবং এলজিইডি পিরোজপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে পৃথক আটটি মামলা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মহারাজ-মিরাজ নিজেদের ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এমন অভিযোগে মামলাগুলো করা হয়েছে। একই সঙ্গে তৎকালীন এলজিইডি পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে ওই অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন,মামলাগুলো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। প্রাথমিক অভিযোগের তুলনায় তদন্তে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তদন্তের চূড়ান্ত ফলের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কের উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী হিসেবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের ছোট ভাই ও সাবেক ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে মিরাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে, এলজিইডি পিরোজপুরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এলজিইডির ওয়েবসাইটে পাওয়া তার মোবাইল ফোনের নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নতুন দরপত্রে কাজ শুরুর উদ্যোগ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পিরোজপুর এলজিইডির উন্নয়নকাজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন।

তিনি জানান, বন্ধ থাকা কাজগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে গত ৯ আগস্ট সচিবালয়ে একটি সভা হয়েছে। সেখানে আইনি জটিলতা নিরসন করে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে স্থগিত উন্নয়নকাজ শুরু করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির কারণে পড়ে থাকা উন্নয়নকাজগুলো পুনরায় শুরু করতে এখন আর কোনো আইনি জটিলতা নেই। দ্রুতই নতুন করে কাজ শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, যে কাজ যে অবস্থায় পড়ে আছে, সেখান থেকেই অসমাপ্ত অংশ শেষ করার জন্য নতুন করে প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হবে। এরপর নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাইদী বলেন, নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কসহ পিরোজপুর জেলায় দুর্নীতির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কাজগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পিরোজপুরের তিন সংসদ সদস্যের বৈঠক হয়েছে। কাজগুলো আইনের মধ্যে থেকে কিভাবে পুনরায় শুরু করা যায়, সে বিষয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় মতামত দিয়েছে চার্জশিট দেওয়ার আগ পর্যন্ত ওইসব প্রকল্পে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া এবং ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্নীতির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কাজগুলো পুনরায় চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষিপণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কটি শুধু পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের পথ নয়; এটি জেলার অন্যতম বড় ভাসমান সবজির বাজার বৈঠাকাটার সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক।

সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয়ের মুখে পড়ছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন, বিল পরিশোধ এবং মাঠপর্যায়ে কাজের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দ্রুত নতুন করে সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হবে। এতে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি বৈঠাকাটা বাজারের সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের যোগাযোগও স্বাভাবিক হবে।




×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত