হাসপাতালের ওয়ার্ড জুড়ে সারিবদ্ধ শয্যা। সেখানে শুয়ে আছেন চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীরা। তবে কারও শয্যাতেই টাঙানো নেই মশারি। কারও মশারি গুটিয়ে শয্যার মাথায় রাখা, আবার কারও শয্যায় মশারির কোনো অস্তিত্বই নেই। আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমে এডিস মশার ডানা ভর করে অন্য মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর চরম ঝুঁকি থাকলেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের চিত্র ঠিক এমনই। রোগী ও স্বজনদের অনীহা আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শিথিল তদারকিতে এই ঝুঁকি প্রতিদিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
চমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ডেঙ্গু কর্নারে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৩৭ জন পুরুষ ও ২৮ জন নারী ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। কিন্তু এর একটি শয্যাতেও মশারি টাঙানো ছিল না।
ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। সংক্রমিত রোগী মশারির বাইরে থাকলে সহজেই এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এরপরও মশারি না টাঙানো নিয়ে অন্তত ১০ জন রোগী ও স্বজনদের প্রশ্ন করলে তাদের কেউ গরম লাগার, কেউ ফ্যানের বাতাস ভেতরে না যাওয়ার অজুহাত দেন। দুজন আবার দাবি করেন, হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হয়নি। নগরীর লাভলেইন এলাকা থেকে তিন চারদিন আগে ভর্তি হয়েছেন ২১ বছর বয়সী আশরাফুল আলম।
তিনি বলেন, গরম লাগে। তাই দিনে মশারি টাঙানো হয়নি। তবে রাতে টাঙাই।
হামজারবাগ এলাকা থেকে আসা আরাফাত হোসাইন বলেন, বুধবার রাতে ভর্তি হয়েছি। এখনো মশারি পাইনি।
বাকলিয়া এলাকা থেকে আসা মো. রায়হান বলেন, আমি আগে বেড পাইনি। কিছুক্ষণ আগে পেয়েছি। তাই টাঙানো হয়নি। একই এলাকা থেকে আসা মো. দিদারও বললেন একই কথা। হালিশহর এলাকা থেকে এক সপ্তাহ আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতালে মশা নাই। তাই মশারি টাঙাই না। পাহাড়তলী এলাকা থেকে আসা ইয়াসিন আরাফাত বলেন, হাসপাতালে অত্যধিক গরম। আর মশারি টাঙানোর ব্যবস্থাও নাই। বড়পোল এলাকা থেকে আসা টুলু বেগম বলেন, রাতে ঘুম হয় না। বেডের ওপরে ফ্যানও নেই। তাই মশারি টাঙাই না।
আরেক রোগী সাজিয়া আফরিন বলেন, ফ্যানের বাতাস নেই। তাই টাঙানো হয় না।
আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সুস্থদেরও : বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর শরীর থেকে এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাস অন্য সুস্থ মানুষ বা অন্য রোগীর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, হাসপাতালে রোগীরা মশারি না টাঙালে সুস্থ মানুষও ডেঙ্গু নিয়ে বাসায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ এডিস মশা ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ানোর পর সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাই নার্সদের উচিত রোগীদের বুঝিয়ে বলা।
এ দিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের কাছে পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে এবং রোগীদের তা ব্যবহার করতে নিয়মিত বলা হচ্ছে। ডেঙ্গু কর্নারে দায়িত্বরত নার্সদের বক্তব্য, মশারি টাঙাতে বাধ্য করতে গেলে রোগীরা উল্টো তাদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে; অন্যথায় আশপাশের রোগী ও স্বজনদের আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকি থেকে যায়।
আগস্টে শনাক্ত জুলাইয়ের দ্বিগুণ : চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়েই বাড়ছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৩৬ জন। আগস্ট শেষ হওয়ার চার দিন বাকি থাকতেও তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩ জনে। এর আগে জুনে ১২২ জন, মে মাসে ৩৭ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মার্চে ২০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৮ ও জানুয়ারিতে ৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে জেলায় মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম মৃত্যুটি ঘটেছিল গত ফেব্রুয়ারিতে এবং বাকি দুজন জুলাইয়ে। আর সর্বশেষ মৃত্যুটি ঘটে গত বুধবার।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে। হাসপাতালের নার্সরা রোগীদের মশারি টাঙানোর বিষয়ে নিয়মিত বলছেন। কিন্তু রোগীদের মধ্যেই মশারি টাঙানোর বিষয়ে অনীহা রয়েছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রোগী ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাড়া, মহল্লা, মসজিদ, মাদ্রাসা বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে এসব বিষয়ে কথা বলতে হবে।