ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে আজকের দিনটি (২৯ আগস্ট) বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও কুলজাতীয় এক লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছিল। ১৪৪ বছর আগে ১৮৮২ সালের ঠিক এই দিনটিতে ওভালে ঘটেছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, যা চিরতরে বদলে দিয়েছিল টেস্ট ক্রিকেটের গতিপ্রকৃতি। মাত্র ৮৫ রানের মামুলি লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ইংলিশরা সেদিন অস্ট্রেলিয়ার গতির ঝড় ও স্পিন জাদুতে এমন এক লজ্জাজনক পতনের মুখে পড়েছিল, যা সেই সময়ের ক্রীড়া বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
আর সেই পরাজয়ের জেরে খোদ ‘ইংলিশ ক্রিকেটের মৃত্যুসংবাদ’ প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম! সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ‘অ্যাশেজ’ নামক অধ্যায়ের।
সেদিন ওভালের উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস মাত্র ৬৩ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি ইতিহাস বদলাতে চলেছে। কিন্তু ‘দ্য ডিমন’ খ্যাত অজি পেসার ফ্রেড স্পফোর্থের বিধ্বংসী বোলিং তোপে স্বাগতিক ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ১০১ রানে অলআউট হয়। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে হুঘ ম্যাসির দুর্দান্ত কাউন্টারঅ্যাটাকের সুবাদে অস্ট্রেলিয়া ১২২ রান করলে ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় সাকুল্যে ৮৫ রান। ডব্লিউ জি গ্রেসের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের সামনে এই রান টপকে যাওয়া ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু ক্রিকেটের রূপকথায় চিত্রনাট্য যে লেখা হয় অন্যভাবে। স্পফোর্থের জাদুকরী বোলিংয়ে ৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে একের পর এক উইকেটের পতন ঘটতে থাকে। দলীয় ৫১ রানে গ্রেস আউট হওয়ার পর ধস নামে স্বাগতিক শিবিরে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৭ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৭ রানের অবিশ্বাস্য এক পরাজয় বরণ করে নেয় ইংল্যান্ড। জন্ম নেয় টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডিং জয়ের।
ম্যাচ শেষের এই অপ্রত্যাশিত ও লজ্জাজনক হার মেনে নিতে পারেনি ব্রিটিশ মিডিয়া। ঘটনার মাত্র তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৮৮২ সালের ২ সেপ্টেম্বর ‘দ্য স্পোর্টিং টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতীকী ও শোকগাথা প্রতিবেদনে ঘোষণা করা হয়, ওভালে সেদিনই মৃত্যু হয়েছে ইংলিশ ক্রিকেটের। সেই সঙ্গে ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছিল, ‘ইংলিশ ক্রিকেট মারা গেছে, দেহটি দাহ করা হবে এবং ছাই (অ্যাশেজ) অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।’
ব্রিটিশ সাংবাদিকতার সেই ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা থেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে জন্ম নেয় অমর এক রূপকথা। পরবর্তীতে যখন ইংল্যান্ড দল অস্ট্রেলিয়া সফরে যায়, তখন সেই ‘ছাই’ বা অ্যাশেজ রূপ নেয় বাস্তবে! প্রচলিত আছে যে, উইকেটের এক জোড়া বেল (যদিও এ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে) পুড়িয়ে সেটির ভস্ম বা ছাই একটি ছোট পাত্রে ভরে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা থেকে জন্ম নেয় বিখ্যাত সেই অ্যাশেজ ট্রফি। তবে মূল ট্রফিটি অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় বর্তমানে বিজয়ী দলগুলোকে উদযাপনের জন্য একটি রেপ্লিকা বা প্রতিকৃতি ট্রফি দেওয়া হয়, আর আসল প্রাচীন ট্রফিটি সংরক্ষিত থাকে লর্ডসে।
১৮৮২ সালের ২৯ আগস্ট ওভালে রটিত সেই শোকগাথা ও প্রতীকী রসিকতা আজ বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন ও দামি দ্বৈরথ অ্যাশেজ রূপেই জীবন্ত হয়ে আছে।