কিয়েভের কাছে অস্ত্রাগারে রুশ ড্রোন হামলা, নিহত ৩৭

আবাসিক এলাকার পাশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৩০টি বাড়ি, আহত ৪২ জন।

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদামে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পর ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খবর বিবিসির।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) গভীর রাতে আবাসিক এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর একটি অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হয়। এরপর সেখানে থাকা গোলা, মাইন ও ড্রোনে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি পরিচর্যা কেন্দ্রও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

জেলেনস্কি বলেছেন, মানুষের বসবাসের এত কাছে বিস্ফোরক সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় সরকারি অবহেলার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আঞ্চলিক প্রধান তিমুর তাকাচেঙ্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণে আহত ৪২ জনের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে। শনিবারও (২৯ আগস্ট) বুচা জেলায় ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছিল। বিস্ফোরণের কারণে গ্রামটির প্রায় ১৩০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রাজধানী কিয়েভের পশ্চিমে মিলা গ্রামে একটি ‘গোলাবারুদ গুদাম’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওই স্থাপনায় এফপি-১ ও এফপি-২ দূরপাল্লার মানববিহীন আকাশযানের উপাদান এবং উৎক্ষেপণ বুস্টার রাখা ছিল বলে দাবি করেছে মন্ত্রণালয়টি।

ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। গোলাবারুদ গুদাম থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে নিজের বাড়ি দেখতে গিয়ে ৪৫ বছর বয়সী লিউবোভ পাভলেনকো বলেন, সবকিছুই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির চারপাশ ও জানালার কাছে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ভবনের কাঠামোও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

লিউবোভ বলেন, তিনি এখনো ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পরে মানসিকভাবে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জেলেনস্কি বলেন, গ্রামে বিস্ফোরক মজুতের সিদ্ধান্তটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এ ঘটনায় সরকারি অবহেলার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে ইউক্রেনের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছিল, মাইলার আবাসিক ভবনের কাছে বিস্ফোরক বস্তু ও উপকরণ স্থাপন এবং মজুতের বৈধতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা হবে।

জেলেনস্কি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি বা অন্য কোনো আবাসিক এলাকার কাছে গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা যায় না। এ ঘটনায় যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এর আগে জুলাইয়ে ভিশনেভে একটি গোলাবারুদের গুদামে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন জেলেনস্কি। ওই হামলার পর বিস্ফোরণে নয়জন নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৮০টির বেশি বাড়ি।

শুক্রবার রাতের ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়া যখন নিয়মিত বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন মানুষের বসতবাড়ির এত কাছে কেন অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।

৬১ বছর বয়সী বোরিস দানিয়িলুক প্রশ্ন তোলেন, জনবহুল গ্রামের পাশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুতের অনুমোদন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কেন দিয়েছিল।

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেতস্কি ভিশনেভের ঘটনার পরও শিক্ষা না নেওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ওই ঘটনার তদন্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুতর গাফিলতি ধরা পড়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক ভবনের কাছে বিস্ফোরক সংরক্ষণের নির্ধারিত নিয়ম মানেনি।

জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাইলা গ্রামের অস্ত্রাগারটি ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করত। কোরেতস্কি বলেন, পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের পঞ্চম বছরে একই ভুল বারবার করা অপরাধমূলক অবহেলা। দায়ী প্রত্যেককে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার দাবিও জানান তিনি।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনজুড়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। জেলেনস্কি জানান, রাতে ওডেসা, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, সুমি ও জাপোরিঝঝিয়ায়ও হামলা হয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ২৩৩টি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। কিয়েভের দাবি, তাদের অভিযান মূলত রাশিয়ার অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।

ইউক্রেন কয়েক সপ্তাহ ধরে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে। ইউক্রেনের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি রুশ সামরিক বাহিনীকে রসদ সরবরাহ করে, তাই এটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু। তবে মস্কো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাশিয়ার স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় বেলগোরোদ ও রোস্তভ অঞ্চলে হামলায় দুইজন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। দখলকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল জাপোরিঝঝিয়ার মস্কো-নিযুক্ত গভর্নর জানিয়েছেন, একটি ইউক্রেনীয় হামলায় শপিং সেন্টারে আঘাত লাগার পর চারজন আহত হয়েছেন।

রুশ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওজোন জানিয়েছে, রাতের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তাদের একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকার ঝুঁকির কারণে আরেকটি লজিস্টিকস কেন্দ্রে কার্যক্রম বন্ধ করে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ক্রাসনোদার, দাগেস্তান, স্তাভরোপোল ও আদিগেয়ায় ওজোনের বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এসব ঘটনায় কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত