ফুটবল মাঠে রূপকথা শব্দটির ব্যবহার বহুবার হয়েছে, কিন্তু জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ক্ষুদ্র জনপদ এলভারসবার্গ যা করে দেখাল, তা আক্ষরিক অর্থেই হার মানাবে রূপকথার গল্পকেও। যে শহরের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার এবং যেখানে নেই কোনো নিজস্ব রেলস্টেশন পর্যন্ত, সেই শহরের একটি ক্লাবই কিনা অভিষেকেই কাঁপিয়ে দিল বুন্দেসলিগার মঞ্চ!
২০২৪ সালের অজেয় চ্যাম্পিয়ন বায়ার লেভারকুসেনকে ঘরের মাঠে ৩-২ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে নিজেদের প্রথম শীর্ষ লিগ মিশন শুরু করল ক্লাবটি। মাঠে ৯ হাজারেরও বেশি দর্শকের বুনো উল্লাস আর নান্দনিক ফুটবল খেলে বিশ্বকে চমকে দিল ছোট্ট এই দল।
চমকের শুরুটা ম্যাচের একদম শুরুতেই। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে লুকাস পেতকভ ও কোল ক্যাম্পবেলের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এলভারসবার্গ। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ডেভিড মোকওয়া ব্যবধান আরও বাড়িয়ে ৩-০ করেন। প্যাট্রিক শিকের নেতৃত্বাধীন লেভারকুসেন শেষ দিকে দুটি গোল শোধ করলেও তা শুধু ব্যবধানই কমিয়েছে, ইতিহাস গড়া জয় আটকাতে পারেনি।
ম্যাচ শেষে স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে এলভারসবার্গ অধিনায়ক লুকাস পিনকার্ট বলেন, ‘এটি একটি অবর্ণনীয় দিন। আমরা এই লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। এই জয় পুরোপুরি প্রাপ্য। দলের জন্য আমি অবিশ্বাস্য রকমের গর্বিত।’
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ও অভাবনীয় এক রূপান্তর। গত পাঁচ বছরে তিনবার প্রমোশন পেয়ে চতুর্থ স্তর থেকে সরাসরি জার্মান ফুটবলের মুকুটে এসে পৌঁছেছে ক্লাবটি। বড় কোনো আর্থিক পুঁজি বা ধনকুবের মালিকের ছোঁয়া ছাড়াই কেবল সুনির্দিষ্ট দর্শন, নিখুঁত স্কাউটিং এবং তরুণ প্রতিভাদের ওপর ভর করে এই উচ্চতায় পৌঁছেছে এলভারসবার্গ।
সাবেক স্পোর্টিং ডিরেক্টর ওলে বুকের বিচক্ষণতায় গত কয়েক বছরে ক্লাবটি তৈরি করেছে একের পর এক অনন্য ফুটবলার, যাদের মধ্যে বর্তমান নিউক্যাসল তারকা নিক ওলতেমাদের মতো নামও রয়েছে। যদিও তাদের প্রধান কোচ ভিনসেন্ট ওয়াগনার এই মৌসুমের টিকে থাকাকে ‘মঙ্গলগ্রহে যাত্রার মতো কঠিন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, তবুও মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি তারা।
ক্লাবের প্রযুক্তিগত পরিচালক জোসেফ ওয়েলজমুয়েলার তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার মূল রহস্য ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘এটা কোনো রূপকথার মতো মনে হয় না, কারণ এখানকার মানুষ যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃঢ় এবং তারা পরিষ্কার জানে ক্লাবের হয়ে তারা ঠিক কী চায়। সাহসিকতা, তীব্র গতি এবং চতুরতা; এই তিন মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের পরিচয় তৈরি হয়েছে।’
শহরের অলিগলিতে এখন শুধু এলভারসবার্গের পতাকা আর জার্সি পরা মানুষের উল্লাস। বুন্দেসলিগার মতো বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচেই লেভারকুসেনের মতো জায়ান্টকে উড়িয়ে দিয়ে এলভারসবার্গ বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল সংখ্যা বাড়াতে আসেনি, নতুন কোনো অধ্যায় লিখতে এসেছে।