জননিরাপত্তার কঠিন সংকট

দায় এড়ানোর অবকাশ নেই

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে  জননিরাপত্তার সংকট কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে প্রায় প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যম এর উদ্বেগজনক সাক্ষ্য বহন করছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা ইতিপূর্বে তাগিদ দিয়েছি, নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উৎসে নজর দেওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা দেখছি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের কেউ কেউ বাস্তবতা এড়িয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন। ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সংসদ ভবনের সামনে ভোরে ছিনতাইকারীর থাবায় প্রাণ হারানোর মর্মস্পর্শী ঘটনাটি বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসার পারদ ফের ঊর্ধ্বমুখী করেছে। ২৯ আগস্ট ভোরে রনজিনা পারভীনের দুর্বৃত্তের হানায় প্রাণহানির বার্তাটি এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে, বাস্তবতা এড়িয়ে গেলে এর প্রতিফল ভালো হয় না। ৩০ আগস্ট দেশ রূপান্তরে উৎকণ্ঠিত এই চিত্রের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আত্মস্বীকৃত খুনি মুহাম্মদ মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’-এর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পুলিশকে দেওয়া তথ্য যেন রূপকথাকেও হার মানায়।

‘গলাকাটা মোবারক’ রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক হত্যার দায় আদালতে স্বীকার করে নির্বিকারচিত্তে তার অপরাধ জগৎ সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। টাকা দিলেই খুন করতে কোনো দ্বিধা করে না সে। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে ইতিপূর্বে এও বলেছি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গুলি সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছলে এর পরিণতি হতে পারে আরও ভয়ংকর। মাসুদুল হত্যাকাণ্ডেই শুধু নয়, ‘গলাকাটা মোবারক’কে  গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে পুলিশও ওই অস্ত্রেরই গুলির মুখে পড়ে। চট্টগ্রামে কারাবন্দি আরেক সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও মোবারক বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী, এও মোবারকেরই ভাষ্য। আমরা দেখছি, শুধু মহানগর-নগর কিংবা শহরেই নয়; অপরাধ জগতের পরিসর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে পড়েছে। খুন, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বহুমাত্রিক অপরাধের গাঢ় ছায়া সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করছে এবং অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর, মুখ্যত পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে-শিক্ষাঙ্গনে-রাস্তাঘাটে সর্বত্র অশুভ শক্তির দাপিয়ে বেড়ানোর রাস্তা কীভাবে আবার প্রশস্ত হলো, কীভাবে সমাজবিরোধীরা ক্রমেই দাপটশালী হয়ে উঠছে এর উৎসে নজর দিয়ে প্রতিবিধানে কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই। দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী গত মে থেকে জুলাই পর্যন্ত  সারা দেশে ৯৩৪টি খুনের মামলা হয়। অর্থাৎ তিন মাসে গড়ে তিনশর বেশি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই হিসেবে দৈনিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ১০টিরও বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য, খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে নিকট অতীতে বলেন, ‘প্রতি মাসে কমবেশি তিনশর মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।’ পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজির ‘খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে’ এই বাক্যবন্ধটি কি দায়িত্ব পালনে তার বা তাদের ব্যর্থতা কিংবা অসহায়ত্বের সাক্ষ্য নয়? পুলিশ কিংবা অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়ত্ব কিংবা দায়িত্বহীন মন্তব্যে অপরাধীরা আশকারা পায়। আমরা মনে করি, অপরাধীদের নিবৃত্তকরণে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের থানাগুলো থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারে অধিক গুরুত্বে কালক্ষেপণ না করে আরও সক্রিয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখা দরকার, ‘জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা’ কিংবা ‘দীক্ষা পিতা’দের অস্পর্শিত রেখে অপরাধের ‘ছাওয়াল’দের নিবৃত্ত করা কঠিন। 

জননিরাপত্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি যেকোনো রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ। আমরা আরও মনে করি, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি তাদের অধিকতর চৌকস করে গড়ে তোলা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পথ করতে হবে সুগম। যেকোনো স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর এর দায় সরকারের। নিরাপত্তাহীনতা সভ্যতার জন্য একটি অভিশাপ। অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু জনজীবন বিপন্নই করে না, তৈরি করে শ^াপদের রাজত্ব। তা তো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত