আন্দোলনের রাজনীতি নাকি মানোন্নয়নের সংগ্রাম

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

কয়েকদিন আগের কথা। এ মাসের শুরুতেই রাজধানী আবারও প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের সাক্ষী হলো। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী যারা জুলাইতে এসেও পদায়ন পাননি, তারা নিজেদের যোগদান ও পদায়নের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ফল প্রকাশের ১৭৫ দিনেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও নিয়োগ কার্যকর না হওয়ায় তারা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন। ২০২৫ সালের শেষভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনে নামেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা, চাকরির ১০ ও ১৬ বছরপূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদান এবং সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা। আন্দোলনের মুখে সরকার ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক দফা বৈঠক হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার ১০ম গ্রেডের দাবি মেনে না নিলেও ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানোর আশ্বাস দেয়। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড ও বিভাগীয় পদোন্নতির বিষয়েও নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থান জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রস্তাব এখনো কার্যকর হয়নি; সহকারী শিক্ষকরা আগের গ্রেডেই রয়ে গেছেন। দুটি আন্দোলনের মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট। একটিতে চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলন করে যোগদানের আশ্বাস আদায় করেছেন, অন্যটিতে কর্মরত শিক্ষকরা আন্দোলন করে বেতন-গ্রেড বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছেন। ফলে একটি বার্তা ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় দাবি আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম যেন শ্রেণিকক্ষ নয়, রাজপথ।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে একজন পড়ান  অ-তে অজগর ঐ আসছে তেড়ে, একজন পড়ান  আ-তে আপেলটা আমি, খাবো পেড়ে। আবার অন্য ক্লাসে একজন পড়ান তিন যোগ দুই সমান পাঁচ। এই তো একটুখানি পড়ানো, এই পড়ানোর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি তাদের দশম গ্রেডের বেতন দিতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবিও ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষদের কাছে ঠিক তেমনই বলে মনে হয়। ভাবখানা এমন যে, দেশের শিশুদের এই তো সামান্য পড়ানোর কাজ, তার জন্য এত বিশাল আবদার! এই ভাবনার কারণও অবশ্য রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা ছিলেন, যারা আছেন, তাদের অধিকাংশের সন্তানই দেশের সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেনি কখনো; যদি পড়াশোনা কেউ করেও থাকে তবে তা ইংরেজি মাধ্যমের এ-লেভেল, ও-লেভেল-এ। তাই প্রাথমিক শিক্ষার বেহালদশা সম্পর্কে ধারণাবিহীন ক্ষমতাবানরা শিক্ষকদের আবদার কিছুটা রক্ষা করে বারবার আন্দোলন বন্ধ করতে চেয়েছেন। কারণ ক্ষমতার বলয়ে থাকা এই মানুষগুলো বিশ্বাস করেন শিক্ষকরা যা পেতেন তা দেশ ও জাতি বিবেচনায় অপচয় আর এখন যা বাড়তি কিছু দেওয়া হবে তাতে অপচয়ের মাত্রা বাড়বে মাত্র আর কোনো উপকার হবে না। কিন্তু এতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কতটুকু অবনতি হচ্ছে, সে বিষয়টি কেউ একবারের জন্য ভাবছেন বলে মনে হয় না। আমাদের সমাজের একটি অংশ মনে করে, প্রাথমিকের শিক্ষকদের দাবি কেন পূরণ করতে হবে? শিক্ষকরা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন তাহলে এই বর্ধিত বেতনের চাহিদা তাদের আবদার নয় তাদের অধিকার হিসেবে, দাবি হিসেবে বিবেচিত হতো এবং বাড়তি ব্যয় অপচয় না হয়ে জাতি গঠনের পুরস্কার হিসেবে দেখার যৌক্তিকতা দাঁড় করতে সবাই বাধ্য হতেন। কিন্তু বাংলাদেশের পরিসংখ্যান তো অন্য কথা বলে। পরিসংখ্যান মোতাবেক, প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা শেষে মোটামুটি বিশ-বাইশ শতাংশ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়ে থাকে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যখন এক-চতুর্থাংশ তখন শিক্ষকদের প্রাপ্তিও সমানুপাত হওয়ার কথা ছিল।

সাধারণ মানুষের একটি অংশ আরও বিশ্বাস করে শিক্ষকদের এই প্রাপ্তি প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো উপকার বয়ে আনবে না। অতীতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ হওয়ার পর দুর্নীতির রেট বাড়িয়ে দেওয়া মানুষ দেখেছে। তাই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে এই প্রাপ্তি শিক্ষকদের স্ব-পেশার উন্নয়নে নিবেদিত করবে না। তারা অতীত ঐতিহ্য থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসবেন না। বরং এখন প্রাথমিক শিক্ষকদের ৯টা সংগঠন আছে তা আগামীতে ১৮টায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। নভেম্বরের আন্দোলনের দিকে তাকালেই আমরা সে নজির দেখতে পাব। সরকারের আশ্বাসে শিক্ষকদের ৫টা সংগঠন আগেই চিৎ-কাত হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল, বাকি ৪টা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি প্রেম হিসেবে জলকামানের তোড়ে ভেসে না গিয়ে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠির বাড়িতে পিছু না হেঁটে কিছুটা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এখান থেকেও শিক্ষকরা শিক্ষা নেবে না। কারণ শিক্ষকরা জানেন যেভাবে হোক প্রাপ্তি প্রত্যাশার অনেক অনেক বেশি। দেশের আমজনতার মনে রাখা প্রয়োজন, এ পর্যন্ত প্রতিটা সরকারই নিজেদের তাগিদে শিক্ষা সংস্কারে ব্রতী হয়েছে সেখানে কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কোনো লক্ষ্য ছিল না। এটা সবাই জানেন প্রাথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে শুধু অবোধ শিশুদের শেখানোর জন্য, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লক্ষ্য জানানো আর বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সৃষ্টির ও বিদ্যার উৎকর্ষ সাধনের জন্য। কিন্তু অন্তত বাংলাদেশে এই তিন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা জাতির কল্যাণে পরিচালিত হচ্ছে তা কোনোভাবে মনে করার কারণ নেই। সরকার মূলত এই শিক্ষা অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাবানদের ইচ্ছাপূরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলছে। দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনায় সংখ্যাগুরু শিক্ষক জোয়ারে ভেসে চলেছেন। এ  কারণে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী সরকার কেউ কোনো কারণ দেখিয়ে দাও দাও করে আন্দোলন সংগ্রাম করলে যাও দিয়ে দিলাম বলে দুহাত তুলে দিয়ে দেয়। প্রাপ্তির আনন্দে উভয় পক্ষই সুখে দিন কাটায়।

আমাদের সমাজ কিন্তু শিক্ষকতা পেশাকে একটু ভিন্ন মাত্রায় দেখতে চায়। একটা সময় শিক্ষকতা পেশা বর্তমানের বিপরীত স্রোতে ছিল। এই যে স্রোতের পরিবর্তন তার দায় অন্যদের কাঁধে চাপিয়ে কোনো লাভ নেই। এখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় লেখাপড়া হয় কিন্তু শিক্ষিত ও বিদ্বান হওয়ার কোনো সুযোগ হয় না। অনুশীলন করে যোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা সংখ্যাগুরু শিক্ষকদের মধ্যে নেই। এর মধ্যে শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট টিউটর বা কোচিংয়ের শরণাপন্ন হতে হয়। এ ব্যবস্থার মধ্যে একজন শিক্ষার্থী না গেলে তার অগ্রগতি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের মতো বিরল ঘটনা। চিকিৎসকদের মতো শিক্ষকরা দিনব্যাপী জনসেবার ব্রত নিয়ে নিবেদিত। সরকার মাঝে মধ্যে দায়সারা কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করে মাত্র। তাতে বিশ্বাস করতে বা বলতে ইচ্ছা হয় যে, সরকার সাধারণ মানুষের জন্য আদর্শগত, কর্মনিষ্ঠ, মানুষপ্রেমী, দেশপ্রেমী শিক্ষাব্যবস্থা আদৌ চায় না। সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করে শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম সোপান প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ কালের দাবি। শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম, মানবপ্রেম সৃষ্টির প্রধান নিয়ামক শিক্ষকদের কিছু দিতে গেলে শুনতে হয় সম্ভব নয় বা সামনে মুলো ঝুলিয়ে দৌড় করাতে হয়। সরকারের যদি সামর্থ্য নেই থাকে তাহলে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে সরকারিকরণে প্রয়োজন হলো কেন? সাধারণ জনগণের তৈরি করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করে বাহবা কুড়ানোরই বা কী দরকার ছিল। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মানের রসাতল যাত্রা সাধারণ মানুষ দেখছে। স্বাধীন দেশে এমন মানহীন শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণ মানুষ দেখতে চায় না। তাই সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের ভিত্তিতে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষাকে অধিকার বলা হলে তার মান রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ জরুরি। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমাগত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ শতাংশের হারে কমেই চলেছে। আজ পর্যন্ত শত চিৎকার সরকারের কানে পৌঁছাল না। দেশি-বিদেশি আবেদন, বৈশ্বিক উদাহরণ সবকিছু উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এতে করে ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা মানুষরা লাভবান হলেও দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে। চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীরা সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিল, সরকারের অংশ হলো কিন্তু শিক্ষা সংস্কারে উদ্যোগী হতে দেখা গেল না কোনো পক্ষকেই। বরং অতীতের  সব রেকর্ড ভেঙে শিক্ষকদের পদে পদে অমর্যাদা করা হলো। দায় শিক্ষকদের নয়, দায় যে ব্যবস্থাপনার সে বিষয়টি কারও বোধবুদ্ধির মধ্যে এলো না। অমর্যাদাবান শিক্ষক দিয়ে সুশিক্ষা হবে না, হতে পারে না। শিক্ষকদের মর্যাদাবান করেই জাতিকে শিক্ষায়-দীক্ষায় মর্যাদাবান হতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে আন্দোলনের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল শিক্ষকতা, কার্যকর শিক্ষা সংস্কার। প্রয়োজন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার্থীদের অর্জন ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করাও সমানভাবে অপরিহার্য। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মর্যাদাবান শিক্ষক সমাজ এবং একটি শিক্ষিত, মানবিক ও দক্ষ জাতি।

লেখক : কারিগরি শিক্ষা,পেশাজীবী অধিকার ও  জনশক্তি উন্নয়ন বিশ্লেষক। সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত