অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা জারি করেছে সরকার। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবার বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কিংবা দায়িত্বশীল নারীর নামে হবে এই কার্ড। দেশের ২ কোটি পরিবারকে এই আর্থিক সহায়তার অর্থ সরাসরি গভর্নমেন্ট টু পারসন (জি-২-পি) পদ্ধতিতে নিয়মিত পরিশোধ করা হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত এই কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন ও স্বয়ম্ভরতা অর্জনে বর্তমান সরকারের একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল। সারা দেশে সমতলের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাড়াগুলোতেও সব জনগোষ্ঠীর জন্য এই সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি কাজ করবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
গত শনিবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এ ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে ৮ ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারকে এ কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়েছে।
এ নীতিমালার মাধ্যমে আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু থাকা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সারা দেশে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলো। এর আগে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে পাইলট পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নির্বাচিত এলাকা ছিল রাজধানীর কড়াইল বস্তি ও মিরপুরের অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি, পাংশা (রাজবাড়ী), পতেঙ্গা (চট্টগ্রাম), বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), লামা (বান্দরবান), খালিশপুর (খুলনা), চরফ্যাশন (ভোলা), দিরাই (সুনামগঞ্জ), ভৈরব (কিশোরগঞ্জ), বগুড়া সদর, লালপুর (নাটোর), ঠাকুরগাঁও সদর এবং নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)।
নীতিমালায় বলা হয়, সরকারের ঘোষিত ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর মূল দর্শন হলো, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এ দর্শনের আলোকে দেশের অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ কোটি দরিদ্র ও নারী পরিবারপ্রধানকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ (৫) সদস্যের বেশি পরিবার সর্বোচ্চ ২টি কার্ড এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০ অতিক্রম করলে ক্ষেত্রবিশেষে ৩টি কার্ড বিতরণের কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে। নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আট শ্রেণির মানুষ পাবেন না ফ্যামিলি কার্ড : নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তা প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বহির্ভূত তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি থাকলে ব্যক্তি বা পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
এক. সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না। দুই. পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি সুবিধার বাইরে থাকবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হলেও ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। তিন. পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করলে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারী এ শর্তের বাইরে থাকবেন। চার. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে সুবিধা মিলবে না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও পরিবারটি বাদ পড়বে। পাঁচ. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিআরটিএ নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রোলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে। ছয়. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকলে তিনি এ কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না। সাত. পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার জন্য যোগ্য হবে না। আট. বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি বা স্পেসের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।