ফারাবী হাফিজ সংবাদ উপস্থাপনা জগতে জনপ্রিয় এক নাম। দেড় দশকের সাংবাদিকতা জীবনে ১৬ বছর জড়িত রয়েছেন সংবাদ উপস্থাপনার সঙ্গে। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের হেড অব আউটপুট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবাদ উপস্থাপনায় আগ্রহী তরুণদের জানিয়েছেন এ পেশায় আসার প্রস্তুতি ও সফল হওয়ার মন্ত্র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান
উদয়কাঠী : আপনার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু কীভাবে?
ফারাবী হাফিজ : আমি জন্মেছি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলায়। গ্রামের নাম গোপীনাথপুর। আমি আমার গ্রামের দ্বিতীয় ব্যক্তি, যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলা থেকেই আমি চাইতাম বড় কিছু করতে। পেরেছি কিনা জানি না। তারই অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজে অর্থ উপার্জন করতে চাইতাম। আর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বিষয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা হওয়ায় টেলিভিশন চ্যানেলে রিপোর্টার হিসেবে যোগদানের জন্য সিভি জমা দিই। আমি ভাবলাম, টেলিভিশনে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে গেলে তো আগে অডিশন দিতে হবে। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে হবে। ওই তাৎক্ষণিক সময়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু নিজেদের প্রস্তুতি হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে স্বরচর্চা করতাম। ওই দুই মাসের চর্চাতেই আমার বেশ একটা পরিবর্তন আসে। ওনারা আমার অডিশন নিলেন এবং সিলেক্ট করলেন। স্বরচর্চা করাটা একজন সংবাদ উপস্থাপকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই যে ছোট্ট চেষ্টা, প্রতিদিন আধা ঘণ্টা, দুই মাস এটা কাজে দিল।
উদয়কাঠী : উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করলেন কীভাবে?
ফারাবী হাফিজ : উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করি পরে। রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার এক বছর পরে সেকেন্ড ইয়ারে আরেকটা টিভি চ্যানেলে জয়েন করি। তখন একটু একটু সেলিব্রেটি হয়ে উঠছি। টেলিভিশনে আমার রিপোর্ট অনেকেই পছন্দ করছেন। তখন নতুন কিছু চ্যানেল এলো। তারা আমাকে পিক করলেন। সংবাদ উপস্থাপনা আমি ভালো করতে পারি হয়তো বুঝেছিলেন। নিজেরও আগ্রহ ছিল। এভাবেই সংবাদ উপস্থাপনার যাত্রা শুরু।
উদয়কাঠী : সংবাদ উপস্থাপক হতে কী কী যোগ্যতা লাগে?
ফারাবী হাফিজ : সংবাদ উপস্থাপক হতে কয়েকটি জিনিস লাগে। প্রথমটি হলো, ভার্বাল কমিউনিকেশন। আরেকটা হলো, নন ভার্বাল কমিউনিকেশন। মূলত ভার্বাল কমিউনিকেশন। উপস্থাপকের চার হাত দূরে একটা টেলিভিশন সেট থাকে। চার হাত দূরে একজন মানুষ আছে মনে করে এমনভাবে কথা বলতে হয়, যেন ওই মানুষটা আপনার কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। আঞ্চলিকতার টান থেকে বের হয়ে এসে একটা সর্বজনীন ভাষা, প্রমিত ভাষায় সঠিক উচ্চারণে প্রতিটি শব্দ ডেলিভারি দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। আরেকটা ব্যাপার, বেসিক জিনিস আমরা প্রত্যাশা করি তা হলো, উপস্থাপকের উচ্চারণটা যেন একটু ভালো হয়, তার কথাটা যেন প্রতিটি শব্দ আলাদাভাবে আমি বুঝতে পারা যায়। কথা যেন শ্রুতিমধুর হয়, কথা যেন পরিষ্কার উচ্চারণেও হয়। এগুলো হলো ভার্বাল যোগ্যতা। আর নন ভার্বাল যোগ্যতা হলো, অনেকের পরিশ্রমের একটা ফসল হলো একটা নিউজ। সেটাকে বিশ^াসযোগ্যভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা। একটা সংবাদ উপস্থাপকের কাছে আসার আগে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হয়ে আসে। একজন রিপোর্টার সারা দিন কষ্ট করে, কখনো কখনো দুই-তিন দিন বা তার থেকেও বেশি দিন ব্যয় করে একটি নিউজ তৈরি করেন। সেটি সেন্ট্রাল ডেস্কে এডিট হয়, নিউজ এডিটর এডিট করেন, রিপোর্টারের সঙ্গে একটা গাড়ি থাকে এর সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীদের একটা পরিশ্রম থাকে ওই নিউজের সঙ্গে, এই সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি সংবাদটি বিশ^াসযোগ্যভাবে যথাযথ এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব থাকে নিউজ প্রেজেন্টারের ওপর। সেখানে নন ভার্বাল কমিউনিকেশনে দক্ষ হতে হয়।
উদয়কাঠী : সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এই গুণটি কি জন্মগত নাকি চর্চার মাধ্যমে অর্জন করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
ফারাবী হাফিজ : অবশ্যই এটি জন্মগত না। আমার কথা এত বেশি পরিমাণে আটকে যেত যে, এখন আমি বিশ্বাস করি সেই আমি যদি নিউজ প্রেজেন্টার হতে পারি তাহলে যে কেউ নিউজ প্রেজেন্টার হতে পারবে। কিছু জিহ্বার ব্যায়াম আছে, নিঃশ্বাসের ব্যায়ামের আছে। ঠোঁটের ব্যায়াম আছে। প্রতিদিন আলাদা করে একটু সময় দিতে হবে, একটু খাটতে হবে, প্রতিদিন এই চর্চাগুলো চালিয়ে যেতে হবে। কারও পাঁচ মিনিট, কারও দশ মিনিট, কারও আধা ঘণ্টা। তাহলেই ভালো কণ্ঠস্বর অর্জন করা যাবে।
উদয়কাঠী : প্রেজেন্টারকে কি অবশ্যই সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হতে হবে?
ফারাবী হাফিজ : না, অবশ্যই না। আমরা মনে করি না উপস্থাপককে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী বা স্নাতক হতে হবে, তবে আমরা এতটুকু দেখি যে, আমার রিপোর্টার যে নিউজটা নিয়ে এসেছে তা উপস্থাপনার যোগ্যতা আছে কিনা। সেজন্য তার উচ্চারণ সঠিক হতে হবে। আমরা কিছু পরীক্ষা নিই। একটা অডিশন নিই। ক্যামেরা টেস্ট নিই। অটো কিউ দেখে তাকে পড়তে হয়। অটো কিউ ছাড়াও তিনি কতটুকু স্বতঃস্ফূর্ত সেটাও আমরা দেখি। আবার রিটেন পরীক্ষাও নিই। আমরা একটু জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, সাম্প্রতিক বিশ্ব সম্পর্কে তার জানাশোনা বোঝা আছে কতটুকু।
উদয়কাঠী : মাঠের অভিজ্ঞতা কি ভালো প্রেজেন্টার হতে সহায়তা করে?
ফারাবী হাফিজ : অবশ্যই। আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনি কীভাবে একজন ভালো উপস্থাপক হলেন সেটা আমি বলব অবশ্যই, রিপোর্টার হিসেবে আমার অর্জিত অভিজ্ঞতা আমাকে সহযোগিতা করেছে। উন্নত বিশ্বে প্রেজেন্টাররা সবাই সাংবাদিক। মাঠের অভিজ্ঞতা থাকলে সংবাদের সঙ্গে রিলেট করা সম্ভব হয়। রিলেট করতে না পারলে ঠিকভাবে এক্সপ্রেশন দেওয়া সম্ভব হবে না।
উদয়কাঠী : সংবাদ উপস্থাপক পেশায় আবেদন শুরু করা উচিত কত বছর বয়স থেকে?
ফারাবী হাফিজ : যদি কারও সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা থাকে তাহলে তিনি গ্র্যাজুয়েশনে ভর্তির পর থেকেই আবেদন শুরু করতে পারেন। আর তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এইচএসসির সময় থেকেই।
উদয়কাঠী : নতুনরা কীভাবে তাদের পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারে?
ফারাবী হাফিজ : নতুন যারা নিউজ প্রেজেন্টার হতে চায়, তাদের জন্য ভালো একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে। আমাদের সময়ে অডিশন দিতে হতো। এখন অ্যাপ্লিকেন্টদের বলা হয়, আপনি কি অন্য কোথাও নিউজ পড়েছেন? তখন অনেকেই বলে, হ্যাঁ, আমি অমুক ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নিউজ পড়েছি। এখন ইউটিউবভিত্তিক অনেক নিউজ পোর্টাল শুরু হয়েছে। সেখানে নিউজ পড়ার সুযোগ থাকে। যারা টেলিভিশনে খবর পড়তে চায় তারা প্রথমে এ ধরনের প্ল্যাটফরমে সংবাদ পড়তে পারে।
উদয়কাঠী : তথ্যপ্রযুক্তির অভাবিত উন্নতির এ সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব সব কর্মক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে?
ফারাবী হাফিজ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়েছে দেশে এবং বিদেশে। কিন্তু সেটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। তার কারণ রক্তমাংসের একজন মানুষ যে এক্সপ্রেশন দেয়, যে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সংবাদটি পরিবেশন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি অবয়ব সেটি দিতে পারবে না। একজন নিউজ প্রেজেন্টার ভার্বাল এবং নন-ভার্বাল দুভাবেই দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবয়ব হয়তো ভার্বালি যোগাযোগ করতে পারবে কিন্তু নন-ভার্বাল যোগাযোগটা করতে পারবে না। দর্শক যখন জানবেন, যে খবরটা পড়ে শোনাচ্ছে সে একজন রোবট, তখন তার ওপর তিনি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবেন না।