দানের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ এএম

মানুষের জীবনে প্রাচুর্যের মূল্য আছে। আবার প্রাচুর্যই জীবনের পূর্ণতা নয়। কেউ যদি সম্পদের পাহাড় গড়েও অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে না পারে, তবে তার সম্পদের সামাজিক ও ধর্মীয় সৌন্দর্য কোথায়? অন্যদিকে সামান্য সামর্থ্য নিয়েও যে ব্যক্তি অন্যের মুখে হাসি ফোটায়, তার জীবন হয়ে ওঠে অর্থবহ। ইসলাম মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করে। দান সেই মানবিকতার অন্যতম উজ্জ্বল প্রকাশ।

দান মানুষের সম্পদ কমায় না। বরং তা সম্পদে বরকত আনে, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। তাই দানের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে আন্তরিকতায়। লোক দেখানো নয়, প্রশংসা পাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া উচিত দানের মূল উদ্দেশ্য।

দান করাকে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল সাব্যস্ত করেছে। এর অনেক ফজিলতও বর্ণিত হয়েছে কোরআন-হাদিসে। তাই ইসলামের অন্যান্য আমলের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটির জন্যও রয়েছে সাধারণ কিছু নির্দেশনা ও নীতিমালা। যদি দানের ক্ষেত্রে সেগুলো রক্ষা করা হয় তাহলে এর যথাযথ প্রতিদান পাওয়া যাবে। আমাদের দান বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে পরকালে নিজের সামনে উপস্থিত হবে ইনশাআল্লাহ। কাজেই সেই নির্দেশনাগুলো আমাদের জানা দরকার।

ইসলামে ক্রমাগত দাতব্য বা চলমান দাতব্য (সাদাকায়ে জারিয়া) এমন কাজ বোঝায়, যা সেটির সূচনাকারীর মৃত্যুর পরও মানবতার উপকার করতে থাকে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন তিনটি ছাড়া তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। এক. সাদাকায়ে জারিয়া। দুই. এমন জ্ঞান, যা দ্বারা উপকার লাভ করা হয়। তিন. এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ বুখারি) সদকায়ে জারিয়ার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

গাছ লাগানো : গাছ লাগানো সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি তিনটি অপরিহার্য সুবিধা প্রদান করে। এর ফল খাওয়া, এর নিচে ছায়া খোঁজা এবং এর কাঠ ব্যবহার করা।

কূপ নির্মাণ : কূপ নির্মাণ করা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি পানির সংগ্রহের বিষয়টিকে সহজতর করে। কূপ খননকারী ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরও মানুষ এটি থেকে উপকৃত হতে থাকে।

মসজিদ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল নির্মাণ : মসজিদ নির্মাণ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। যখনই সেই মসজিদে কেউ প্রার্থনা করে তখনই নির্মাণকারী সওয়াব অর্জন করতে থাকে। দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করে অসহায় রোগীদের মধ্যে ফ্রি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা করা যেতে পারে। খুব স্বল্প ব্যয়ে দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করা যায়। মাদ্রাসা নির্মাণ করেও সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব অর্জন করা যায়। সেখান থেকে মানুষ যতদিন দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করবে ততদিন পর্যন্ত নির্মাণকারী ব্যক্তি সওয়াব পেতে থাকবে।

এ ছাড়া দান-সদকা ও মানবসেবার মাধ্যমে দুনিয়াবি ফায়দাও রয়েছে। এর মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়। দানকারীর জন্য তার দান বিপদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। যার ফলে বিপদাপদ দানকারীকে স্পর্শ করতে পারে না। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা অতিসত্বর দানের দিকে ধাবিত হও, কেননা বিপদাপদ দানকে অতিক্রম করতে পারে না। (শুয়াবুল ইমান)

সর্বোপরি মানবসেবা মহৎ ইবাদত। এ সেবার মাধ্যমে সমাজের হিংসা-বিদ্বেষের মতো অধঃপতিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা যায়। তা ছাড়া এ সেবা কার্যক্রম প্রত্যেকেই চালিয়ে যেতে পারে। আইনজীবীরা আইন মারফত মজলুমের সাহায্য করে, তাদের মামলা-মোকদ্দমায় বিনা পারিশ্রমিকে সহায়তা করতে পারে। ডাক্তাররা প্রাথমিক ওষুধপথ্যের মাধ্যমে এবং ফ্রি চিকিৎসা ও অতিরিক্ত ফি না নিয়ে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে। এ রকম প্রতিটি সেক্টর থেকেই নিজ নিজ পরিসরে এ মহান সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। সুতরাং প্রতিটি মুমিনের উচিত পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বাণীকে হৃদয়ে লালন করে ইহকালীন এবং পরকালীন কল্যাণের নিমিত্তে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করা।

আর দান করার ক্ষেত্রে শুধু অর্থ ব্যয় করাই শেষ কথা নয়। দানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন অভাবী মানুষ যখন সাহায্যের জন্য কারও কাছে হাত বাড়ান, তখন তিনি শুধু অর্থের প্রয়োজন প্রকাশ করেন না, অনেক সময় নিজের অসহায়ত্বও প্রকাশ করেন। তাই তাকে সাহায্য করার সময় তার আত্মমর্যাদার প্রতি যতœশীল হওয়া জরুরি। এমনভাবে দান করা উচিত নয়, যাতে উপকারের বদলে তার মনে অপমানের অনুভূতি তৈরি হয়।

কোরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত সুন্দর শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দানকে নষ্ট কোরো না।’ (সুরা বাকারা ২৬৪) অর্থাৎ দান করার পর উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, বারবার নিজের দানের কথা বলা কিংবা গ্রহীতাকে অপমান করা দানের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।

দান হতে পারে প্রকাশ্যে, আবার গোপনেও। অনেক সময় গোপনে করা দান মানুষের অন্তরকে রিয়ার আশঙ্কা থেকে বেশি সুরক্ষিত রাখে।

তাই দানের পরিমাণের চেয়ে নিয়ত ও পদ্ধতির গুরুত্ব বেশি। অল্প হলেও আন্তরিক দান আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় সহযোগিতা করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া কিংবা কোনো অসহায়ের প্রয়োজন পূরণ করাও দানের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি অর্থ না থাকলেও ভালো কথা বলা, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করা এবং কারও প্রয়োজনীয় কাজে পাশে দাঁড়ানোও সওয়াবের কাজ।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত