বিশ্বের অর্ধেক বনভূমি মাত্র পাঁচ দেশে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ থেকে শুরু করে বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণ, জলচক্রের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—প্রকৃতির এই সবুজ ঢাল মানবসভ্যতার টিকে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ বিশ্বের বনভূমি ভৌগোলিকভাবে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বরং কয়েকটি দেশেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে এর বড় একটি অংশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি হেক্টর। এর প্রায় অর্ধেকই রয়েছে মাত্র পাঁচটি দেশে। সবচেয়ে বেশি বনভূমি রয়েছে রাশিয়ায়। বিশ্বের মোট বনভূমির প্রায় ২০ দশমিক ১ শতাংশের মালিক দেশটি। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি পাঁচ হেক্টর বনভূমির প্রায় এক হেক্টরই রয়েছে রাশিয়ায়।

বনভূমির পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। বিশ্বের মোট বনভূমির ১১ দশমিক ৭ শতাংশ রয়েছে দেশটিতে। এরপর রয়েছে কানাডা, যার দখলে রয়েছে বৈশ্বিক বনভূমির ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বনভূমি। আর তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা চীনের দখলে রয়েছে বিশ্বের মোট বনভূমির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

শীর্ষ ১৫টি বনসমৃদ্ধ দেশের তালিকায় আমেরিকা মহাদেশের আধিপত্যও স্পষ্ট। এই তালিকার আটটি দেশই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত। ব্রাজিল, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রয়েছে পেরু, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলা। বিশাল ভূখণ্ড, বিস্তৃত ক্রান্তীয় বনাঞ্চল এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র এসব দেশকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বনভাণ্ডারে পরিণত করেছে।

আফ্রিকায় বিশ্বের মোট বনভূমির প্রায় ১৬ শতাংশ রয়েছে। তবে মহাদেশটির দেশগুলোর মধ্যে বনভূমির বণ্টন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি বনভূমি রয়েছে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। বিশ্বের মোট বনভূমির প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রয়েছে দেশটিতে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বনভূমির উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। পুরো অঞ্চলজুড়ে বিশ্বের মোট বনভূমির মাত্র প্রায় ১ শতাংশ রয়েছে।

বিশ্বের বনভূমির এমন অসম বণ্টন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষ করে বনসমৃদ্ধ দেশগুলোতে বড় ধরনের দাবানল হলে তার প্রভাব আর শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। কানাডার দাবানল এর বড় উদাহরণ। দেশটিতে প্রায় প্রতিবছরই দাবানল মৌসুম বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। ভয়াবহ দাবানলে কোটি কোটি হেক্টর বনভূমি ও গাছপালার আচ্ছাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের কারণে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাবও সীমান্তের মধ্যে আটকে থাকে না। কানাডার ভয়াবহ দাবানলের ধোঁয়া প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে সেখানকার বায়ুর মানকে বিপজ্জনকভাবে খারাপ করে তোলে। ফলে একটি দেশের বনভূমিতে ঘটে যাওয়া দুর্যোগও দ্রুত আঞ্চলিক এমনকি আন্তঃমহাদেশীয় পরিবেশগত সংকটে রূপ নিতে পারে।

রাশিয়া ও কানাডার ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের প্রতি ১০ হেক্টর বনভূমির মধ্যে প্রায় তিন হেক্টর রয়েছে এই দুই দেশে। ফলে দেশ দুটির বিশাল বনাঞ্চলে সংঘটিত বড় কোনো দাবানল বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে দাবানলের ধোঁয়া হাজার মাইল দূরের অঞ্চলেও পৌঁছে বায়ুর গুণমান নষ্ট করতে পারে।

বনভূমি তাই শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বনভূমির বড় একটি অংশ যেসব দেশে কেন্দ্রীভূত, সেসব দেশের বন সংরক্ষণ, অবৈধ বন উজাড় রোধ, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং দাবানল মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন বৈশ্বিক পরিবেশ সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

সূত্র: ভিজুয়াল ক্যাপিটাল

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত